পৃথিবীর ‘মিথ্যা’ চেহারা
বিবিসি বা সিএনএন-এ আবহাওয়ার সংবাদগুলো আমি কৌতুহল নিয়ে দেখি। মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি টিভির পর্দার দিকে। কোথাকার বায়ুপ্রবাহ কোথায় ছোটে, কোথাকার মেঘ কোথায় উড়ে যায় – দেখে অবাক লাগে। গ্রাাফিক্স-টাফিক্স মিলিয়ে এখন খুবই প্রাণবন্ত করে তোলা হয়েছে আবহাওয়ার খবরগুলো। উপস্থাপক মওকামতো ঠাট্টামশকরাও করেন।
তবে আরেকটা কারণে আবহাওয়ার সংবাদ আমার ভালো লাগে। টিভিপর্দায় পৃথিবী নামক গ্রহটাকে এই যে দিনে বারবার করে দেখানো হচ্ছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, এটা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমরা একটা অভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। যতোই মারামারি আর খুনোখুনি করি, একে অন্যের বিরুদ্ধে জিঘাংসা পুষে রাখি, মানবজাতি হিসেবে আমাদের নিয়তি বাধা পড়ে আছে ভুগোলের ছকে। একই মেঘ উড়ে যাচ্ছে দেশকালের সীমানা ডিঙিয়ে, একই বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে সাদা আর কালোকে, ধনী আর গরীবকে, উপনিবেশ কর্তা আর উপনিবেশিতকে। মনে মনে ভাবি, আমাদের নৈমিত্তিক ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডির ভেতরে এই বৃহৎ সত্যের ছবি এভাবে প্রতিদিন দেখতে দেখতে মানুষের মধ্যে এমন এক মহানুভবতার বোধ হয়তো জন্ম নেবে, যা এতোদিন সম্ভব ছিল না। আবহাওয়ার সংবাদ আমাদের মহল্লা জীবনের চিকণ গলির ভেতর এক বৃহৎ সত্যের জানালা প্রতিদিন মেলে ধরছে।
কিন্তু এটা যখন ভাবি, তখন এর বিপরীতে আরেকটা চিন্তাও উঁকি দেয়। আবহাওয়ার খবরে পৃথিবীর যে ছবি দেখানো হচ্ছে টিভির পর্দায়, সেই ছবি কতোটা সত্য? যে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে মেঘ উড়ে যাচ্ছে, সেই ভূখণ্ড কতোটা বাস্তব?
খোঁজখবর করে জানতে পারছি, টিভির পর্দায় পৃথিবীর ওই ছবির ভেতরেও মিথ্যার খানিকটা প্রলেপ মাখানো আছে। লুকানো আছে তথ্যের ইচ্ছাকৃত বিকৃতি আর স্বার্থের অভিলাষ।

মানচিত্র আসলে আমাদের সামনে এক মিথ্যা পৃথিবীর চিত্র হাজির করছে প্রতিদিন। না করে উপায় নেই। কেননা মানচিত্রকরণ প্রক্রিয়াটাই আসলে এক ধরনের তথ্য বিকৃতকরণ প্রক্রিয়া।
একটু ভেঙে বলা যাক। আমরা শৈশব থেকে পাঠ্যবইতে পৃথিবীর যে মানচিত্র দেখে দেখে বড় হয়েছি, আমাদের স্কুলঘরের দেয়ালে যে মানচিত্র টাঙানো থাকে, সেখানে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকা মহাদেশের চেয়ে বড়। কিন্তু বাস্তবে ওরকম দশটা গ্রিনল্যান্ড ঢুকে যাবে আফ্রিকার ভেতর। উত্তর আমেরিকাকেও তার সত্যিকার আকারের চেয়ে বড় দেখানো হয়। মানচিত্রে চীনের আকার তার প্রকৃত আকারের চেয়ে ছোট। অস্ট্রেলিয়াও সত্যিকারের চেয়ে পছাট। কেন এমন হলো?
আমাদের এই চিরচেনা মানচিত্রটা আসলে পৃথিবীর অনেকগুলো বিকল্প মানচিত্রের একটা। এই মানচিত্রটাই সবচয়ে জনপ্রিয়। অন্য মানচিত্রগুলোকে হটিয়ে গত চারশ বছর ধরে এটা এমনভাবে চালু হয়ে গেছে যে, পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলোর সত্যিকার চেহারা হিসেবে এটাই আমাদের কল্পনায় স্থায়ী আসন গেড়েছে। কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্রবিদ্যায় পৃথিবীর এই মানচিত্রটিকে বলে মার্কাটরস প্রোজেকশন। বাংলায় বলা যায় মার্কাটরের প্রক্ষেপ।
মানচিত্র তৈরির ব্যাপারটার গোড়াতেই একপ্রকার জোড়াতালি আছে। এর কারণ একটা গোলকের পৃষ্ঠদেশকে একটা চারকোণা কাগজের সমতল পৃষ্ঠদেশে এঁকে দেখানোটাই আসলে অসম্ভব কাজ। জ্যামিতির যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই কাজটা করা হয়, তাকে বলে প্রোজেকশন বা প্রক্ষেপ। কিন্তু এই প্রক্ষেপে গোলকের পৃষ্ঠদেশের সব বৈশিষ্ট্য হুবহু রক্ষা করা সম্ভব হয় না। বেশকিছু বৈশিষ্ট্য জলাঞ্জলি দিতে হয়। একজন মানচিত্র নির্মাতাকে তখন বাছাই করতে হয়, তিনি কোন বৈশিষ্ট্যগুলো রাখবেন আর কোনগুলি তার না হলেও চলবে।
ফ্লেমিশ মানচিত্রবিশারদ জেরারদুস মার্কাটর ১৫৬৯ সালে যে মানচিত্রটি তৈরি করেন, সেটায় তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশের রেখাগুলিকে গ্রাফচিত্রের মতো সমকোণে পরস্পরছেদী সরলরেখা হিসেবে তুলে ধরা। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন বিন্দুর মধ্যে যে কৌণিক অনুপাত, সেটা ঠিক রাখাও তার কাজ ছিল। এই মানচিত্র তিনি তৈরি করেছিলেন ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্রযাত্রার সুবিধার কথা চিন্তা করে। আর তা করতে গিয়ে তিনি ভূখণ্ডগুলোর আপেক্ষিক আয়তনকে বিকৃত করেছেন। কিন্তু এই বিকৃতি প্রয়োজনের নৈর্ব্যক্তিক নীতি অনুসরণ করেনি। এর মধ্যে সচেতনভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী মনোবৃত্তি চরিতার্থ করা হয়েছে। উত্তর গোলার্ধের ভূখণ্ডগুলো এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের ভূখণ্ডগুলোর চেয়ে। চীন ও ভারতকে ছোট দেখিয়ে ইউরোপকে আরেকটু বড় করে দেখানোর তাগিদের পেছনে ছিল প্রভু মনোভাবের তুষ্টিলাভ।
মার্কাটরের এই মানচিত্র এ কারণেই অন্যগুলোকে টেক্কা দিয়েছে। দুদিকেই এটা উদ্দেশ্য সিদ্ধি করেছে।
তাই বলে ভাববার কোনো কারণ নেই, মার্কাটরের মিথ্যাকে সরিয়ে সত্যতর কোনো মানচিত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রত্যেক মানচিত্রই কোনো না কোনো বিকৃতি ধারণ করে।
কেউ কেউ বলেন, মানচিত্র তৈরি অনেকটা কবিতা অনুবাদ করার শামিল। আপনি যখন কবিতা অনুবাদ করেন, তখন এক ভাষার তল থেকে অর্থকে আপনি স্থাপন করেন অন্য একটি ভাষার তলে। তা করতে গিয়ে মানচিত্রের প্রক্ষেপণের মতোই সংকটে পড়েন আপনি। সবকিছু অক্ষত রেখে কবিতাকে কখনওই ভাষান্তর করা যায় না। একটা ভাষার এমন কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো ঠিক অনুবাদযোগ্য নয়। তাছাড়া আপনি উপমা-উৎপ্রেক্ষাগুলো ঠিক রাখবেন, নাকি ছন্দ ঠিক রাখবেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনুবাদ কবিতা সবসময়ই মূল কবিতার একটা অপভ্রংশ মাত্র।
জার্মান চলচ্চিত্রকার আর্নো পিটারস মার্কাটরের মানচিত্রের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন এই বলে যে, এটা একটা বর্ণবাদী মানচিত্র, পশ্চিমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠাই যার মূল উদ্দেশ্য। এর বদলে পিটারস ১৯৭০-এর দশকে নতুন একটি মানচিত্র বানিয়ে দিলেন, যেটাকে বলে গল-পিটারস প্রোজেকশন। এতে বর্তুলাকার সম-আয়তন প্রক্ষেপ পদ্ধতি ব্যবহার করে পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলোর আপেক্ষিক আয়তন সঠিক রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতে বিকৃত হয়ে গেছে ভূখণ্ডগুলোর আকার। এগুলো তাদের সত্যিকার আকৃতির চেয়ে লম্বাটে দেখায়। এই মানচিত্র দুই মেরুতে ভূখণ্ডগুলোর আনুভূমিক বিকৃতি ঘটিয়েছে। তাছাড়া বিষুবীয় অঞ্চলে উলম্ব রেখা বরাবর বিকৃতি ঠেকানো যায়নি।
মার্কাটারের মানচিত্রে যতোই বিকৃতি থাক, এখনও সেটাই চালু আছে। টিভিপর্দার আবহাওয়ার সংবাদে, এমনকি গুগলের মানচিত্রেও মোটামুটি ওই পুরনো মানচিত্রটিই অনুসরণ করা হয়। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য মার্কাটরের মিথ্যা মানচিত্রের মধ্যেই আঁটসাঁট করে বসানো হয়।
কথা হলো, একটা নিখুঁত মানচিত্র কোনোদিনই পাওয়া সম্ভব নয়। ব্রিটিশ লাইব্রেরির মানচিত্র বিভাগের প্রধান পিটার বারবারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মানচিত্র কী? তিনি বলেছিলেন, মানচিত্র হলো মিথ্যাচার। যতোক্ষণ না আপনি এক-অনুপাত-এক স্কেলের মানচিত্র তৈরি করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি মানচিত্র আসলে কোনো না কোনোভাবে সাবজেক্টিভ, মানে ওটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। আপনি কিছু জিনিস বেছে নিচ্ছেন, কিছু জিনিস ফেলে দিচ্ছেন।
এক-অনুপাত-এক স্কেলের মানচিত্রের অসম্ভব চিন্তা আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি গল্পেও আছে। ‘অন দ্য এক্সাকটিচ্যুড অব সায়েন্স’ বা ‘বিজ্ঞানের অভ্রান্ততা’ নামে তাঁর একটি ক্ষুদ্র্রকায় গল্পে তিনি এমন এক সাম্রাজ্যের কথা শুনিয়েছেন, যার শাসক হুকুম দিয়ে ওই রাজ্যের এক-অনুপাত-এক স্কেলের একটি মানচিত্র বানিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ মানচিত্রের আয়তন সাম্রাজ্যের আয়তনের সমান।
দেড়শ শব্দের ক্ষুদ্র একটি গল্প। পড়লে এটাকে বোর্হেসের একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ফাজলামো বলে মনে হতে পারে। তবে ইতালিয়ান লেখক ও চিহ্নবিজ্ঞানী উমবের্তো একো এই ক্ষুদ্র গল্প নিয়ে বিরাট এক প্রবন্ধ লিখে ফেললেন। তাঁর প্রবন্ধের নাম ‘এক-অনুপাত-এক স্কেলে একটি সাম্রাজ্যের মানচিত্র তৈরির অসম্ভাব্যতা’। একো বুঝে দেখার চেষ্টা করলেন বোর্হেসের গল্পের ওই মানচিত্র তৈরি করতে গেলে বাস্তবে কী কী সমস্যা দেখা দেবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ওরকম একটি মানচিত্র আপনি রাখবেন কোথায়? ওটা রাখতে যে আরেকটা রাজ্য লাগবে। অথবা আপনি আপনার রাজ্যের ওপরেই সেটা এমন চাদরের মতো বিছিয়ে রাখবেন, যাতে খাপে খাপে মিলে যায়। পাহাড়ের খাপে পাহাড়, নদীর খাপে নদী। তাতে মূল সাম্রাজ্যটা আর দেখা যাবে না। দেখা যাবে কেবল মানচিত্রটাকে। কিন্তু তখন বলা মুশকিল হয়ে যাবে কোনটা কার প্রতিনিধিত্ব করছে। সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে মানচিত্র নাকি মানচিত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে সাম্রাজ্য? একো আসলে ভাষার রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্বের দার্শনিক সংকট এখানে টেনে এনেছেন। ভাষার সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক আর পৃথিবীর সঙ্গে পৃথিবীর মানচিত্রের সম্পর্ক একই সংকট নিয়ে হাজির হয়।
প্রশ্ন হলো, সেভাবে দেখলে পৃথিবী কি আসলে পৃথিবীরই একটি মানচিত্র মাত্র নয়?
বিজ্ঞান লেখক, উপন্যাসিক, সাংবাদিক