যদিও নিজেকে নিজে বকুনি দিই এই বলে, যে আমার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে প্রবাসে থেকে থেকে আর তাই আমি কলকাতায় এলে উদভ্রান্তের মতো ট্যাক্সি খুঁজি এবং পারলে বাড়ি থেকেই না বেরোনোর ফিকির… আসল ব্যাপার হলো, আমি আজকাল কলকাতা শহরে বাসে চড়তেই ভয় পাই। এমন অমার্জিত চোয়াড়ে বখাটে ছোঁড়াদের মতো বেশিরভাগ বাসের হাবভাব আর চেহারা! আগে আগে এতো ভয় করত না কিন্তু । স্মার্টলি বাসে চড়তাম। এখন উঠতে নামতে পদস্খলনের ভয়। এই বুঝি বাস ছেড়ে দিল আর আমি চাকার তলায়। পা-দানিগুলো এইসা উঁচু লাগে! আমার একারই নয় কিন্তু। একবার আমার মা কন্ডাক্টরকে এই একই অনুযোগ করতে সে হতভাগা নাকি খ্যাকখেকিয়ে হেসে বলেছিল, ‘পা-দানি তো সব ঠিকই আছে মাসিমা, কোনো ‘পব্লেম’ নেই। আপনি মাইরি মনে হয় আগের চেয়ে বেঁটে হয়ে গেছেন!’
আর এখনকার এই সব বাস এমন ঝকরঝকর করে চলে যে, পেটের ভেতরে মনে হয় ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝালমুড়ি বানাচ্ছে কেউ।
কিছু অবশ্য নতুন বাস হয়েছে। কিন্তু সে তো কিছুতেই দরকারের সময়ে পাই না!
ট্রাম? সেও কি আর আগের মতো আছে? চেহারাপত্তর তো বিগতযৌবনা লোলচর্মা বিরলকেশী সুন্দরীদের মতো। সেই আগের মিঠে বোলে ঘুঙুর বাজিয়ে গজেন্দ্রগামিনী রূপটি কই? এখন দেখলে মনে হয়, লাঠি নিয়ে কুঁজো বুড়ি চলেছে কোঁকাতে কোঁকাতে। সময়মতো যতœ-আত্তি না হলে যা হয় আর কী! তবু কিন্তু আমি ট্রাম দেখলে আহ্লাদিত হই। বেশ ঠাকুমা দিদিমার কোলে বসে আছি মনে হয়। এখনও কলকাতার ট্রাম খুব সামান্য হলেও আমাকে পুরোনোদিনের গন্ধ ফিরিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় ট্রামের পাশাপাশি কলকাতার লাল টুকটুকে সেই ডবল ডেকার বাসকেও। স্বপ্নের মতো ফিরে আসে শিশুবেলার বাতাস। অস্ফুটে বলে, মনে পড়ে?
পড়ে না আবার! খুব মনে পড়ে!
খুব ছোটবেলায় আমি বেজায় হাড় জ্বালিয়েছি বাবা-মাকে। খালি ট্যাক্সি চড়তে চাইতাম। বাসে উঠলেই বমি। তখন এতো বাঙালি বিহারী ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল না। বেশিরভাগই সর্দারজী। আর সব সর্দারজীই যেন একে অন্যের যমজ ভাই। আমি ভাবতাম, বাব্বা! একটা ফ্যামিলিতে কত গাড়ি!
তারপর কিন্তু একটু বড় হতেই বাসে চড়ার মজা চিনে গেলাম। সে এক দারুণ বাস। লাল টুকটুকে দোতলা বাস। তার গায়ে হুমদো কেঁদো রাগী ভাঁটার মতো জ্বলজ্বলে চোখওয়ালা ‘সোঁদরবনের’ বাঘের ছবি। একতলায় বসে কোন আহাম্মক! সোজা ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে তুরতুর করে ওপরে উঠে ছুট্টে গিয়ে বসি একেবারে সামনের সিটে। যদি খালি না থাকে? ওত পেতে থাকি কতক্ষণে খালি হবে আর নিতান্তই যদি বেড়ালছানার ভাগ্যে শিকে না ছেঁড়ে, তাহলে মনে মনে রেগে টং হয়ে থাকি । বড় বড় জানলা দিয়ে কাচ পেরিয়ে খুদে মু-ুটা ঝুলিয়ে দিই বাইরে, ফুরফুরে হাওয়া বিলি কেটে যায় আমার চাইনিজ কাট চুলে। সোজা সামনে তাকালে নীচের রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া- মানুষজন সবকিছুকে কেমন ‘প্রজা প্রজা’ মনে হয়, আর নিজেকে ‘ বোম্বাগড়ের’ রাণী।
দোতলায় কিন্তু একতলার মতো লেখা থাকে না ‘কেবলমাত্র মহিলা ও শিশুদের জন্য’ আর ‘তিন বৎসরের উর্ধ্বে পুরা ভাড়া লাগিবে’। একতলায় আবার কী সব অজানা রোগ-বালাইয়ের জন্য পলিক্লিনিক আর কম পয়সার কোচিং ক্লাসের ঘোষণাও করা হয় সস্তার বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে। সেগুলো গঁদের আঠা দিয়ে সাঁটা, জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে কাগজ। নতুন যুক্তাক্ষর পড়তে শিখে সেগুলো বিড়বিড় করে পড়ি, নেহায়েত যদি একতলায় বসতেই হয়! বেশি ভিড়ে কোলে বসতে পিত্তি চটে যায় । দাদুর সঙ্গে বাসে চড়লে বাড়তি মজা। পকেটে লজেন্স আর হজমিগুলি। মা থাকলে ঝামেলা। ‘জানলা দিয়ে হাত বাড়াবে না’, ‘ইস হতচ্ছাড়া মেয়ে … ঠিক নোংরা হাত, বাসের হাত মুখে দিলো’, ‘বাড়ি গিয়ে আগে হাত না ধুলে দেখবে মজা’… অনন্ত শাসন! কন্ডাক্টর একটা বাদামী চামড়ার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে। ঝুনঝুন খুচরো পয়সা আর দু আঙুলের ফাঁকে জাপানি খুদে হাতপাখার মতো সাজানো নোটের বাহার আর টিকিটের বা-িল। কী ভালো অঙ্ক জানে! ঠিক টাকাপয়সার যোগ-বিয়োগ করে দেয় পটাপট! হাঁ হয়ে যাই। কোনো কোনো বাসের গায়ে উত্তম সুচিত্রার ছবি লটকানো থাকে। আরিব্বাস! কী সুন্দর যে দেখতে! আর… বাসের গায়েই প্রথম দেখি ‘লাল ত্রিকোণ’। বুঝিনি। বাবার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। বাবা বলেছিল, ‘বড় হলে বুঝবে।’ আমি, মনে আছে, বলেছিলাম, ‘আচ্ছা ।’
আর ভালো লাগত ট্রাম। টিং টিং ঘণ্টি বাজিয়ে হেলতে দুলতে যায়। ফার্স্টক্লাসে ঘন সবুজ রেক্সিনের গদি, সেকেন্ডক্লাসে পেছন ব্যথা করা খটখটে কাঠের সিট। কয়েক পয়সার ভাড়ার তফাত। আমি যেখানে ভীড় কম সেখানেই উঠি। কিন্তু জানলার ধার চাই। অনেকক্ষণ ধরে ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলি। ফার্স্টক্লাসে আবার খাঁচা দেওয়া পাখা আছে ছাদে। সেগুলো সাতজন্মেও সাফ হয় না। এখানেও বাসের মতোই কন্ডাক্টর কাকু খাকি পোশাক পরে। ট্রামের টিকিট হালকা হালকা রঙের। গোলাপী, নীল, সবুজ। কী যে জমানোর ঝোঁক আমার! পুরো আদেখলে!
মনে আছে, খুব চাইতাম দোতলা বাস বা ট্রামে চড়ে টার্মিনাস টু টার্মিনাস যেতে। ওইটা আমার সেরা বেড়ানো! আমার ঝাঁ চকচক মলের দোকানপাট ছিল না, রেস্তোরাঁতে অতো খাওয়ার ব্যাপার ছিল না, হুটহাট মার্কেটিং এর গল্প ছিল না। উইক-এন্ডে প্যাকড পিকনিক লাঞ্চ নিয়ে কলকাতার আশেপাশে যাওয়াও ছিল না। ওই ট্রাম আর বাস… ওই পুষ্পক রথে চেপে মাটির স্বর্গের পথে পথে পারিজাতের গন্ধ খুঁজে ফেরা ছিল শুধু।
যে পারিজাত এখন… এই শহর কলকাতায়… বড় অলীক বলে মনে হয়। কিছু কিছু পুষ্পগন্ধ শুধু ভুলে যাওয়া রংধনুতে আর ফেলে আসা হাওয়ায় রয়ে যায় হয়তো।
লেখক কবি, অনুবাদক ও গল্পকার