কেমন কাগজ চাই

79

গুগলের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে ইন্টারনেটে বিজ্ঞানের যন্ত্রণার কথা মনে আছে? ওইযে, চাই বা না চাই; বিজ্ঞাপন এসে হাজির। আর এমনই বিজ্ঞাপন যে তাড়াতাড়ি দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে হতো। অপরিচিত কারো সামনে ইন্টারনেটে ব্রাউজিং করা ছিল অস্বস্তিকর কাজ। কিন্তু ‘মা গুগল’ আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন ইন্টারনেটে যা পড়তে চাই, কোনো যন্ত্রণা ছাড়াই পড়তে পারি। তবে বিজ্ঞাপনের যে একটু আধটু টোকা নেই , তা নয়। কিন্তু এখন আমি পাঠক, ক্রেতা হিসেবে ওগুলো নিয়ন্ত্রণ করি। তারপরও আমার মন কেমন উসখুস করে। স্ক্রিনে পড়ার সময় আমি কাগজের গন্ধ পাই না, জিভে আঙুল লাগিয়ে পাতা ওল্টাতে পারি না। এতদিনের অভ্যাস ছাড়বো কি করে? সিডনিতে যদিও কাগজের পত্রিকা পাওয়া যায়, কিন্তু বিজ্ঞাপনের বাহারি আবদার আর অত্যাচারে লেখাগুলো পড়ার আর ধৈর্য থাকে না। বাংলা সিনেমার দুর্দিন চললেও সিনেমার পোস্টারগুলো কিন্তু এইসব পত্রিকায় বেঁচে আছে। আপনাদের নতুন পত্রিকার জন্য ‘মা গুগল’-এর কাছ থেকে পরামর্শ নিন। বিজ্ঞাপন ছাড়া টিকে থাকার উদাহরণও তো আমাদের আছে। বিচিত্রার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের কথা মনে আছে? ওখানে বাহারি রং আর কার বিজ্ঞাপন কত বড়, সেটা মুখ্য ছিল না। কিন্তু যার যা দরকার তা খুঁজে নিতো। এই প্রক্রিয়াটি এখনো সচল। কেবল আমাদের পত্রিকাগুলোতেই দেখি না।
আচ্ছা আপনারাও কি ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করবেন ? এখন হাতের একটি ক্লিকে আমরা স্মার্টফোনেও ঢাকায় কি হচ্ছে তা জেনে যাই। সেই একই খবর দিয়েই কি পৃষ্ঠা সাজাবেন? তাহলে আপনাদের পত্রিকার প্রয়োজনটি কি? বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আমি সংবাদপত্রের হালচাল বুঝি না। শুধু বুঝি, একটি পত্রিকা হাতে নিয়ে বলতে চাই- বাহ্ চমৎকার।
প্রবাসে আমাদের বেড়ে ওঠার আনন্দ আর কষ্টের গল্পগুলো কি আমরা বলি? কেউ কি শুনতে চায়? আমার মনে হয়, সেই গল্পগুলো বলার পরিবেশ নেই বলেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বলি না। আর বলি না বলেই আমাদের মধ্যে দূরত্ব কেবল বাড়ে। কিন্তু দেখবেন, যখন কেউ তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা গল্পটি বলে, অন্যজনও চোখ মুছতে মুছতে বলে ওঠে- আরে আমারও তো এমন হয়েছে। গল্পের এই আশ্চর্য রসায়নটি এখনো কোনো প্রবাসী পত্রিকাই ছুঁয়ে যেতে পারেনি। তাই আমাদের ‘এখানকার’ পত্রিকাগুলো ‘ওখানকার’ খবরগুলো টুকে দেয়। অথচ প্রবাসের এই গল্পগুলো আমাদের সবাইকে একসুতোয় বাঁধতে পারে কিন্তু। আপনারা কি চেষ্টা করে দেখবেন, প্রবাসের গল্পের এই রসায়ন দিয়ে নতুন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা যায় কিনা? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো এখানেই বেড়ে উঠছে। আমাদের পৃথিবী তো ওদেরকে ঘিরেই। তাহলে ওদের নিয়ে আমরা একটি বড়ো কমিউনিটি গড়ে তুলি না কেন? আমরা চেষ্টা করি না তা নয়। কেউ কেউ করেন। কিন্তু প্রায়ই আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যায়।
পত্রিকা একটি অস্ত্র। ঢাকা বলুন আর সিডনিই বলুন, সুযোগ পেলে এর মালিক আর কর্ণধার এই অস্ত্রটি নিজের কাজে ব্যবহার করতে একটুও চিন্তা করেন না। অন্যকে ভয় দেখিয়ে কোণঠাসা করার জন্য প্রিন্ট মিডিয়ার কি কোনো জুড়ি আছে? এমন ভয় দেখানোর খেলায় আপনারা যেন যোগ না দেন। আপনাদের পত্রিকা হাতে নিয়ে যেন একজন পাঠকও না ভাবেন, দেখি এবার কাকে ডোবালো? ফেসবুক আর ইউটিউব আমাদের নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই এক একটি পত্রিকার কর্ণধার হয়ে যেতে পারি কিন্তু!
কম্পিউটার প্রযুক্তি এতোটাই এগিয়েছে যে আগামী কয়েকবছরে আমরা স্ক্রিনে ফুলের রং নয়; সম্ভবত সুবাসও পাবো। খাবারের ছবি আর গন্ধে আমাদের জিভে জল আসবে। এইদিক দিয়ে আমরা সিডনির প্রবাসীরা মনে হয় বেশ খানিকটা এগিয়ে। এমন কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ হয়, তখন তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা জানালা খুলে দিতে হয়। নতুবা দুর্গন্ধ পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যকে আক্রমণ করে, ছোট করে নিজেকে কি বড় করা যায় ? নিজেকে কি আর নিজে মাপা যায় ? ওটা তো করবে অন্যজন। এক পাল্লায় থাকবো আমি আর অন্য পাল্লায় থাকবে আমার কাজ, অন্যের জন্য আমার মমতা। আমরা অন্যকে যতটা গুছিয়ে ধারালোভাবে আক্রমণ করি, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আবর্জনা বের করি, ঠিক ততোটা গুছিয়ে যতœ করে কিন্তু গদ্যচর্চা করি না। আমি বিশ্বাস করি, এই গদ্য এবং পদ্যগুলো পড়ার জন্য পাঠকের অভাব হবে না। আপনাদের পত্রিকা এই ধারাটিকে উৎসাহিত করুক।
শেষ কথা। আপনার পত্রিকায় যারা লিখবেন, অনুগ্রহ করে তাদের ঠিকানায় একটা গিফটকার্ড হলেও পাঠিয়ে দেবেন। তা সে যত ছোট অংকেরই হোক না কেন। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে দায়িত্ব। ওই গিফটকার্ড দিয়ে কেউ বাড়ির মর্টগেজ শোধ করবেন না; কিন্তু জানবেন তার কাজটির মূল্য আছে। আর মূল্যবান জিনিস সবার কাছেই সমাদৃত। আমরা শুদ্ধধারায় কিছু কাজ দেখতে চাই। আমার এই প্রত্যয়, আপনারা এই ‘ভিন্ন তৃষ্ণার’ পাঠকদের কথা মনে রাখবেন। আপনাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা।
জন মার্টিন লেখক ও নাট্য ব্যক্তিত্ব

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.