‘আলাভোলা’ ফখর যখন বিস্ময়

77

সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে তাঁর ব্যাটিং অনেককেই ধন্দে ফেলে দিয়েছিল। ভারতীয় বোলারদের পাত্তাই দেননি পাকিস্তানের এ ওপেনার। নাম তাঁর ফখর জামান। ১১৪ রানে আউট হওয়ার আগে ¯্রফে ভারতীয় বোলারদের কচুকাটা করেছেন তিনি। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে ফখর-আজহার আলী পাকিস্তানকে দুরন্ত শুরু এনে দেন। যার কল্যাণে ওভালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ভারতকে উড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাসি হেসেছে পাকিস্তানই।
এই ম্যাচে আজহার ধীরলয়ে ব্যাট চালালেও মাত্রই চতুর্থ ম্যাচ খেলতে নামা ফখর ছিলেন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক। ১২৮ রানে দু’জনের ভুল বোঝাবুঝিতে আজহার (৫৯) রান আউটে কাটা পড়লেও থামেননি ফখর। ভারতীয় বোলারদের একের পর এক বাউন্ডারিতে আছড়ে ফেলে সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। দলের রান যখন ঠিক ২০০ তখন ১১৪ রানে ফিরে যান ফখর। তাঁর এই ইনিংসটি সাজানো ছিল ১০৬ বলে ১২ চার আর তিন ছক্কায়।
মূলত ফখরের সৌজন্যেই ৩৩ দশমিক ১ ওভারে ২০০ রানের দেখা পায় পাকিস্তান। এমনই এক ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন তিনি, যে ম্যাচের দিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ চোখ মেলে রেখেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের বিপক্ষে এক সেঞ্চুরি করেই তারকা বনে গেছেন তিনি! অথচ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগেও তাঁকে কেউ সেভাবে চিনতই না। আর চিনবেই বা কেমন করে! ফখরের যে তখন ওয়ানডে অভিষেকই হয়নি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাঁর অভিষেক। সে ম্যাচে ৩১ রান করার পরের দুই ম্যাচেই তুলে নেন ফিফটি।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫০ ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে ৫৭ রান করেন ফখর। এই দুই ম্যাচ পাকিস্তান জিতলেও পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেননি ফখর। যা ভারতের বিপক্ষে তার সেঞ্চুরিতেই হয়ে গেছে।
২৭ বছর বয়সী ফখরের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথ চলাও খুব বেশিদিন হয়নি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর অভিষেক। দুই ম্যাচ খেলে করেছেন ২৬ রান। গড় ১৩.০০।
ক্রিকেটার ইউনিস খানের এলাকা মারদানে জন্ম নেওয়া ফখর পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করার পুরস্কারটাই পেয়েছেন এবারের এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে সুযোগ পেয়ে। ২০১২ সালে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষিক্ত হওয়ার পরের বছরই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার অভিষেক। লিস্ট ‘এ’-র ব্যাটিং গড় ৫০.০৪! প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গড়টাও নেহায়েত মন্দ নয়-৪২.০১।
দিনের পর দিন পাকিস্তানের ‘পুরস্কারহীন’ ঘরোয়া সার্কিটে সংগ্রাম করেছেন তিনি। পরিশ্রমের যে বিকল্প কিছু হয় না- এই আপ্তবাক্য নতুন করে মনে করিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা দিয়েছেন। শুরুটা ভালোই হয়েছে, এখন নিজেকে এই জায়গা থেকে কতটা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারেন, দেখার বিষয় সেটিই।
সর্বশেষ পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ঘরোয়া ক্রিকেটের কায়েদে আজম ট্রফিতে ফখরের মোট রান ৬৬৩। গড় ৫১। ফাইনালে ১৭০ রানের একটি ইনিংস খেলার পর তাঁকে আর উপেক্ষা করতে পারেননি নির্বাচকেরা। কিছুদিন আগে ঘরোয়া ওয়ানডে প্রতিযোগিতায় করেছেন তিনটি ফিফটি ও একটি সেঞ্চুরি।
২৭ বছর বয়সী এই তরুণের মধ্যে যেন গ্রামের সরল একটা প্রতিচ্ছবি আছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাকচিক্য তাকে এখনো পেয়ে বসেনি। খেলার ধরনেও যেন কোনো ভয়-ডর নেই। নিজের মতো করে খেলেন। প্রতিপক্ষ কে, ম্যাচটা ফাইনাল কি না, খারাপ খেললে বাদ পড়ে যাবেন কি না… কোনোকিছুই যেন স্পর্শ করে না তাঁকে। এমনকি ফাইনালের পর রাতারাতি পাকিস্তানিদের কাছে নায়ক বনে গেলেও এখনো যেন বাইরের কোনোকিছুই স্পর্শ করেনি ফখরকে, ‘তখন তো খুব একটা বুঝিনি। তারপর এখানে ফিরে এলাম, মানুষ আমাকে দেখার জন্য ভিড় করতে শুরু করল… তাদের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে, নিশ্চয়ই বীরের মতো কিছু একটা করেছি।’- ফখরের এই কথাই যেন মানুষটিকে চিনিয়ে দেয়।
এখনো তার মধ্যে গ্রামের সেই আলাভোলা তরুণটা আছে বলেও সংবাদমাধ্যমের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন ফখর। জাতীয় দলে খেলার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। ‘নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়া ছিল আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়া। সেখানে আমার কোচ নাজিম খান আমার খেলা দেখে বলেছিলেন, তুমি শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেট খেলতে পারবে।’ আর আজ সেই কোচের কথাই যেন বাস্তবের রূপকথায় বদলে দিয়েছেন ফখর।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.