২০৫০ সালে রবির একদিন

1,125

স্বপ্নটা মনে নেই। শুধু মনে আছে মনখারাপ করা স্বপ্ন। রাতে খুব বিষণœ ধরনের স্বপ্ন দেখেছে রবি। ভাবছে ভুলে যাওয়া স্বপ্ন মনে করিয়ে দিতে কোনো টেকনোলজি থাকা দরকার। ও আর আজ কাজ করবে না, ঠিক করে ফেললো। কাজের মুড নেই একদম। স্বপ্নটা মনে না পড়ার বিষয়টা মন থেকে যাচ্ছে না। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (আই) রমরমা বাজার হলেও ‘আই’ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে কাজ-কারবার এখনও শুরু করেনি। এরই মধ্যে শোওয়ার ঘরের বিল্ট ইন ‘আই’ টের পেয়ে গেছে রবির ঘুম ভেঙেছে। আর তাতেই মিষ্টি ভলিউমে বেজে উঠলো- ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে।’
গানটার ভাষা বাংলা। রবি ভাষাটা খানিকটা বোঝে। দরকার হলে ভয়েস-ট্রান্সলেট করে নেয়। মায়ের কাছে শুনেছে, এ গানের লেখক এবং সুরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি প্রায় ১১০ বছর আগে মারা গেলেও এখনও অনেকেই আগের মতোই তার গান শোনে। মা নিজেও রবীন্দ্রভক্ত বলেই একমাত্র সন্তানের নাম রেখেছেন রবি।
স্বচ্ছ, তাপবান্ধব ছাদের ভেতর দিয়ে ভোরের নীলাকাশে সোনালি রোদের পরশ খেলা করছে। আকাশের দিকে তাকাতেই ঘরের ‘আই’ গানের ভলিউম কমিয়ে খুব মোলায়েম কণ্ঠে সারাদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে দিলো। পূর্বাভাসে কোনো ধরনের সম্ভাবনার কথা বলা হয় না। ঝড়, বৃষ্টি, বায়ুপ্রবাহ কিংবা তাপমাত্রার ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হুবহু মিলে যায়।
রবি বাথরুমে গেলো। বাথরুম, টয়লেট দুই-ই স্মার্ট। কমোডের বিল্টইন পরীক্ষাযন্ত্র বলে দিলো শরীরের অবস্থা স্বাভাবিক। সুগার, ফ্যাট- এসবের পরিমাণ ঠিকঠাক আছে। শরীরে কোনো জীবাণুর অন্প্রুবেশ ঘটেনি। সব জেনেশুনে হালকা মনে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালো রবি। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই নেমে আসলো ওর পছন্দের তাপমাত্রায় পছন্দের ফ্লেভারের সাবানমিশ্রিত জলধারা। স্মার্ট শাওয়ারের স্বয়ংক্রিয় শরীর ঘষামাজার ব্যবস্থা থাকলেও শরীর ঘষামাজায় এখনও প্রাচীন পন্থাই পছন্দ রবির। তবে শাওয়ার শেষে গরম বাতাসে শরীর শুকাতে ওর খারাপ লাগে না।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই স্মার্ট আয়না মুখ-চোখ স্ক্যান করে বলে দিলো, চোখ ও ত্বকের স্বাস্থ্য সবকিছু ঠিকঠাক আছে। রবির মন ফুরফুরে হয়ে গেলো। বাসার সাউন্ড সিস্টেম ‘আই’ এর জানা আছে এমন সময়ে মোজার্ট এর আলাতুর্কা কিংবা বিটোফেনের ফিফথ সিম্ফনি শোনে রবি। আলাতুর্কার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিয়ে রবি গেয়ে ওঠে, ‘তুত তুতু- তুরুরু তুরুরু’। এমন সময় মায়ের ফোন। মা সারা পৃথিবী হিল্লিদিল্লি করে বেড়ায়। পেশায় আইনজীবী। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের পক্ষে ইউরোপ-আমেরিকার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়ছে।
আজ কাজ করছে না জেনে মা রবিকে বৃদ্ধ নানার সঙ্গে দেখা করতে বললো। নানাকে ওর খুব ভালো লাগে। রিটায়ার্ড হোমে থাকে। ফিলোসফি নামের পুরোনো এক বিষয়ে বিস্তর পড়াশোনা তার। নানার নাম ইমতিয়াজ কায়েস রিশা। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে নানা-নানি আর মা বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া মাইগ্রেট করেছিলো। রবির মামা স্পেস সায়েন্টিস্ট, বর্তমানে চাঁদে অবস্থিত স্পেস গবেষণাকেন্দ্রে কর্মরত।
আজ সারাদিন কিছু খাবে না রবি। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এর না খেয়ে থাকার দিন আজ। সারাদিন শুধু পানি খাবে সে। উবারে গাড়ির ডাক পাঠালো রবি। নানা থাকেন কাটুম্বা ব্লু মাউন্টেনের ওপরে। কাটুম্বা যেতে লাগবে প্রায় ৪৫ মিনিট। একা একা যাবে বলে শেয়ার্ড গাড়ি ডাকেনি। গাড়ির কোনো ড্রাইভার নেই। কোনো গাড়িরই ড্রাইভার থাকে না। জাহাজ, প্লেন, ট্রেন কোনোকিছুরই চালক থাকে না আর। গাড়ির ব্যক্তিগত মালিকানা বলে কিছু নেই। দূষণ কমাতে সারাদেশ জুড়ে আছে পুল অব কারস। গাড়িগুলো সোলার, বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেনচালিত হাইব্রিড স্বয়ংক্রীয় গাড়ি। গত পাঁচ বছরে একটাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেনি অস্ট্রেলিয়ায়।
গাড়িতে উঠতেই গাড়ি জিজ্ঞাসা করলো, রবি গান শুনবে না সিনেমা দেখবে, খেলা দেখবে? নাকি খবর শুনবে। ফুটবলে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন এবং রোবট দলের মধ্যকার খেলাটা দেখতে চাইলো রবি। মানুষ কোনো খেলাতেই রোবটের সঙ্গে আর পেরে ওঠে না। পাসিং, ড্রিবলিং, পেনাল্টিতে রোবট কোনো ভুল করে না। বিরুদ্ধ দলের খেলোয়াড়ের গতিবিধি আগাম টের পেয়ে যায়। সব ধরনের খেলায় এদের নৈপুণ্য বেড়ে গেছে। কোচ এবং ম্যানেজাররা ‘আই’ ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেয় খেলোয়াড়দের।
প্রথমার্ধেই পাঁচ-শূন্য গোলে পিছিয়ে গেল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নরা। রোবটের কাছে হেরে যাওয়া দেখতে ভালো লাগে না রবির। যদিও রোবট দলের ফ্যানের সংখ্যাই বেশি। অবশ্য এক অর্থে রোবটের জয় মানে তো মানুষেরই জয়। এই রোবটের ডিজাইনাররা তো মানুষই।
নানা খুব আরাম করে বারান্দায় বসে আছেন। হাতে একটা কাগজের বই। কাগজে ছাপানো বই এখন দুষ্প্রাপ্য। পৃথিবীতে নতুন করে আর কাগজ উৎপাদন হয় না। সবকিছু ডিজিটালাইজড। পুরোনো বইয়েরই শুধু কিছু কিছু এখনও রয়ে গেছে। রবিকে দেখে নানার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। রবি বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো দিগন্তজোড়া হালকা নীল সবুজ রঙের পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ। বিশাল ল্যান্ডস্কেপ। ভালো লাগার আবেশে রিশা নাতি রবিকে একটা হাগ দিলো। রবি বইটা হাতে নিয়ে বুঝলো এটা বাংলা বই। নানা বললেন, এটা জীবনানন্দ দাসের কবিতা সমগ্র। রবি এর আগে এসে নানাকে বটবক্র কিনে দিয়ে গেছে। বটবক্রে পৃথিবীর সেরা সব দার্শনিক, লেখকদের কণ্ঠ এবং ধ্যানধারণা স্টোর করা আছে। চাইলেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও আলোচনায় মেতে ওঠা যাবে।
রবির এতোদূরে না আসলেও চলতো। হলোগ্রাম কনভারসেশনে নানার সঙ্গে আলাপ করতে পারতো। ওর আসলে নানাকে মানে ইমতিয়াজ রিশাকে স্পর্শ করতে ইচ্ছে করছিলো। আজ ও সারাদিন টেকনোলজি থেকে দূরে সরে থাকবে। নানার কাছে বসে থাকবে। রবি আজ ৭০- ৮০ বছরের অতীত বাংলাদেশের গল্প শুনবে।
লেখক, পেশাজীবি, পরিবেশবিদ

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.