‘স্যার, আমার যে শোক করারও সময় নেই…’

509

– স্যার ও রাতে একরত্তিও ঘুমায় না। দিনের বেলা একটু আধটু ঘুমায়, তাও মরফিনের অ্যাকশন যতক্ষণ থাকে। এর মধ্যে আত্মহত্যাও করতে চেয়েছে। বাবুটার দোহাই দিয়ে ঠেকিয়েছি।
তিরিশোর্ধ ভদ্রমহিলার পাশে বছরপাঁচেক বয়সের মিস্টি ফর্সা পাতলাসাতলা শিশুটি অবাক হয়ে মায়ের কথা শুনছে, বুঝলো কি বুঝলো না! হুইল চেয়ারে বেশ পরিপাটি দাড়ির চমৎকার গড়নের মানুষটা মাথা নীচু করে আছেন।
– আই হ্যাভ অনলি থ্রি মান্থস ইন মাই হ্যান্ডস- পরিস্কার উচ্চারণ শুনে খানিকটা চমকে উঠলাম।
– কে বলেছে?
– প্রথমে বাংলাদেশের ডাক্তার। পরে সিঙ্গাপুরের। তবে সিঙ্গাপুর সময় বেঁধে দেয়নি, অবস্থা ভালো না বলেছে।
একগাদা কাগজ ঘেটে যা পেলাম- Malignant Peripheral Nerve Sheath Tumor (Pelvic region) with multiple bone and lung mets সিঙ্গাপুরে Debulking surgery Gici Drop foot, lifelong catheterization এর মতো দূর্বিসহ জীবন এখন। খুব একটা আশ্বাস দিতে পারলাম না।
এরপর এক অন্যরকম সংগ্রাম শুরু। অবিশ্বাস্য ফললাভ। একবছর পার হয়ে গেছে। ব্যথা নেই। কোনো ব্যথার ওষুধ লাগে না। লাং বা ফুসফুস পরিষ্কার, কিন্তু এখনও লেশন আছে পেলভিক রিজিয়নে এবং হাড়গুলোতে। সেকেন্ড লাইন কেমো যেদিন শুরু করবো, সেদিন কেবিনে জনাদশেক লোক দেখে খানিকটা বিরক্ত হলাম। অভিব্যক্তি দেখে বলে উঠলো- আমরা চলে যাচ্ছি, কিন্তু এদের কাছে আপনার কথা এতো শুনেছি, তাই একটু দেখে গেলাম- বলে উঠলেন একজন। বিব্রত বোধ করলাম। এরপর কিছুদিন পার হলো। নির্দিষ্ট সময়ে কেমো নিতে আসলেন না তিনি। যখন রিপোর্ট নিয়ে তার স্ত্রী আসলেন তখন কারণটা বললেন। শাশুড়ী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
মাসখানেক হাসপাতালেও ছিলেন, প্রচুর রক্তশূন্যতা ছিলো, শেষপর্যন্ত চারদিন আগে মারা গেছেন। পুরো সনাক্ত করা না গেলেও ডাক্তারদের সন্দেহ; ক্যানসার হয়েছিলো। কিছু আর বলার ছিলো না। খানিকটা সান্ত¡না দিলাম। এর মধ্যে আরও কয়েক দফা এসেছেন। চিকিৎসা চলছে। ভালো আছেন। মাঝে মাঝে বাবুটা মায়ের সঙ্গী হয়। লেখার প্যাড, কলম দিই। ছোট্ট করে থ্যাংক ইউ বলে।
পরশু। বুধবার। ভদ্রমহিলার সঙ্গে প্রায় সমবয়সী আরেকজন। অবাক ও ভীত হলাম। আজ তো আসার কথা না। তাহলে কি খারাপ কিছু হয়ে গেলো? তাকালাম। কিছু বলার আগেই,
– আমি কি করবো স্যার? ও আবার আত্মহত্যা করতে চায়।
– হঠাৎ কি কষ্ট বেড়েছে?
– ও ভালো আছে। কিন্তু?
চুপ করে দুজনের দিকে তাকালাম। চোখে জল কি!
– শাশুড়ী মারা গেলেন। ওর এই অবস্থা, আর’… আর বলতে পারলেন না। ডুকরে উঠলেন।
– আমার বাবুটার যে লিউকেমিয়া ধরা পড়লো স্যার। কিছুদিন থেকে জ্বর আর ভীষণ দূর্বল, তাই গত সপ্তাহে বঙ্গবন্ধুতে ভর্তি করানোর পর স্যাররা আজ এই কথাই বললেন।
চেম্বার। তিনজন মানুষ। নিথর। নিরব। কথা নেই কারো মুখেই। দুজন মাথা নীচু করে। দুজনেরই আঁচলে মুখ ঢাকা। চোখে জলের ধারা।
– স্যার কী হলো আমার। আমি যে শোক করারও সময় পেলাম না।
আলতো করে মায়ের হাতে হাত রাখতেই টেবিলে মাথা রেখে ডুকরে উঠলেন।
– স্যার রিপোর্ট কি ভুল হতে পারে না?
বাবুটার কচিমুখটা ভেসে উঠলো। চোখের জল বুঝি সংক্রামক?
লেখক চিকিৎসক, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.