বেফাঁস মন্তব্যের জেরে বিপদে ট্রাম্প

332

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে শ্বেত- শ্রেষ্ঠত্ববাদী হিসেবে পরিচিত উগ্রপন্থীদের সঙ্গে ফ্যাসিবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের জন্য উভয়পক্ষকে দায়ী করে দেওয়া বক্তব্যের পর তুমুল সমালোচনার তোপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন মুলুকের উগ্র এইসব বর্ণবাদীদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোয় দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করার পাশাপাশি তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়েও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ভাষ্য হচ্ছে, সাম্প্রতিক এই বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে না পারলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যর্থ হবেন ট্রাম্প।
সম্প্রতি মার্কিন মুলুকে শার্লটসভিলে দাসপ্রথার সমর্থক বিতর্কিত জেনারেল রবার্ট লি এর মূর্তি অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘কু ক্লাক্স ক্লান’সহ অন্যান্য আরও কয়েকটি বর্ণবিদ্বেষী দল সমাবেশ ডাকে। কু ক্লাক্স ক্লান এর কয়েক শ সশস্ত্র সদস্য ও নাৎসিপন্থীরা পতাকা ও জ্বলন্ত মশাল নিয়ে সেখানে জড়ো হয়ে ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী শ্লোগান দেয়, এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার দাবি জানায়।
এদিকে, স্থানীয় গির্জা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে পাল্টা বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। দুইপক্ষের সংঘর্ষ এড়াতে জরুরি অবস্থা জারির পরও ৩০ জনের বেশি আহত হয়। নাৎসিপন্থীদের একজনের বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হওয়ার কারণে মানবাধিকারকর্মী হিদার হেয়ার নিহত হন।
এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহিংসতার নিন্দা করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য ‘সকল পক্ষ’কেই দায়ী করে এক বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। এরপর এক লিখিত বক্তব্যে নয়া নাৎসিপন্থী ও শ্বেত সন্ত্রাসবাদীদের নাম উল্লেখ করে তাদের সমালোচনা করেন ট্রাম্প। কিন্তু তার পরদিনই নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সহিংসতার জন্য উভয়পক্ষকেই দায়ী করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘মূর্তি অপসারণের প্রতিবাদে যারা জড়ো হয়েছিলেন, এরমধ্যে অনেক ভালোমানুষও ছিলেন। আবার ফ্যাসিবিরোধীদের অনেকেই ওই সহিংসতার জন্য কম দায়ী নন।’
পাশাপাশি জেনারেল লি এর মূর্তি অপসারণের প্রতিবাদ করে ট্রাম্প জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি জর্জ ওয়াশিংটন এবং দেশটির তৃতীয় প্রেসিডেন্ট জেফারসনও একসময় দাসপ্রথা সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত দাস ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা আজ লি এর মূর্তি সরাচ্ছি, কালকে কী ওয়াশিংটন বা জেফারসনের মূর্তিও আমরা সরিয়ে দেব?’
ট্রাম্পের এই জেনারেল লি এর সঙ্গে দেশটির দুই প্রধান স্থপতির তুলনার কারণে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও বারাক ওবামার সাবেক উপদেষ্টা ডেভিড গার্গেন ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। অপর একজনের মন্তব্য হচ্ছে, ইতিহাস শিখতে আবারও নতুন করে স্কুলে ভর্তি হওয়া উচিত ট্রাম্পের।
তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে বেজায় খুশি শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা। কু ক্লাক্স ক্লানের সাবেক প্রধান ডেভিড ডিউক ট্রাম্পের সততা আর সাহসের প্রশংসা করেছেন। এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পক্ষে উগ্রবাদীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সংখ্যায় কম হলেও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের এরা একটি প্রধান অংশ। পাশাপাশি এদের খুশি রাখতেই ট্রাম্প শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী হিসেবে পরিচিত স্টিভ ব্যাননকে তাঁর প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
এদিকে, এ ঘটনার পর একাধিক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, বর্ণবাদীদের পক্ষ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সিনেটর গ্রাহাম যেমনটি বলেছেন, রিপাবলিকান সদস্যরা শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে ভিন্নমতই পোষণ করেন না, তাঁর এই বর্ণবাদী অবস্থানেরও তীব্র বিরোধিতা করেন। এই প্রসঙ্গে ট্রাম্পের দলের আরেক সিনেটর বলেছেন, বর্ণবাদী ও তাদের বিরোধীদের একইভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
এতদিন চুপ থাকলেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর পুত্র জর্জ বুশ সম্প্রতি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বর্ণবাদ ও ইহুদি বিরোধিতাকে অবশ্যই বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এর পাশাপাশি মার্কিন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখার প্রধানরাও বর্ণবাদের বিরোধিতা করে বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে,মার্কিন সেনাবাহিনী বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আদপেই সমর্থন করে না।
একদিকে যেমন রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাতের ইস্যুতে অব্যাহত তদন্ত ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, পাশাপাশি সাম্প্রতিক শার্লটসভিল এর ঘটনাটির কারণেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে নৈতিক বৈধতা হারাতে চলেছেন। উপরন্তু দলের ভাবমূর্তির বিবেচনায় ট্রাম্প কীর্তির এমন ধারাবাহিক বিতর্কও রিপাবলিকান দলের নেতারা আর কতদিন সহ্য করবেন, সেটাও চিন্তার বিষয়।
এরই মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে রিপাবলিকানদের সম্পর্কচ্ছেদের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষক ই জে ডিওন। তিনি বলেছেন, ‘অশিক্ষিত, বিভক্তি সৃষ্টিকারী, মানসিক ভারসাম্যহীন, আত্মকেন্দ্রিক ও অনৈতিক এমন মানুষকে ক্ষমতার ধারেকাছেও থাকতে দেওয়া অনুচিত।’
তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.