মানবিক উদারতার বাংলাদেশ

570

জাতীয়তাবাদের অপপ্রয়োগে বিরক্ত সাধারণ নাগরিকের সামনে জাতীয়তাবাদের সঠিক প্রয়োগের একটি দৃষ্টান্ত উপস্থিত হয়েছে। সাধারণ নাগরিক সমাজ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার নানা সংকটে প্রধানমন্ত্রীর ও সরকারের সমালোচনা করে। কিন্তু দেশ যখনই বহিঃশত্ররুর দ্বারা আক্রান্ত হয়; তখন এই জনমানুষই জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুপ্রিম কমান্ড হিসেবে মান্য করে।
মায়ানমার কর্তৃক “রোহিঙ্গা শরণার্থী পুশ ইন” আর আকাশ সীমা লংঘন করে হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশে ঘোরাঘুরি করিয়ে পেশীপ্রদর্শন ও যুদ্ধের উস্কানির সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেত্রী থেকে সামষ্টিক জনমানুষের নেত্রী হয়ে উঠেছেন। ভূ-রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখে শেখ হাসিনা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে খুব কঠিন অথচ মানবিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার কারণে বিশ্বনন্দিত হয়েছেন। মায়ানমার সরকার যখন রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও উচ্ছেদ চালাচ্ছিলো; ভারত, চীন, পাকিস্তানের সরকারগুলো তখন ব্যবসায়িক স্বার্থে মায়ানমার সরকারের এপোলজিস্ট হয়ে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে স্বার্থপর নীরবতায় চলে যায়। একাকী বাংলাদেশ তখন ব্যবসায়িক ও নিজস্ব অন্যান্য স্বার্থের কথা না ভেবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়।
বিশ্বমানবতা তখন দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মানবিক নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে সোনালী হৃদয়ের মানুষ বলে সম্মান জানায়। ইতিহাসের সঠিক মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই একজন মানুষের জন্য অমরতার আয়োজন করে; একটি জাতির জন্য সভ্যতার অভিজ্ঞান নিশ্চিত করে। গোটা পৃথিবীর মানুষই এখন জানে মানবিক ঔদার্য্যের দেশ বাংলাদেশ।
এখন বাংলাদেশের এই বিশ্ব অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে সমাজের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আগমনে দেশের অভ্যন্তরে কোন বিশৃংখলা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করাই বিশুদ্ধ জাতীয়তাবাদ। বিশ্বের মানবিক ও সভ্য একটি দেশের যে সম্মান বাংলাদেশ পেয়েছে; তার যোগ্য নাগরিক আচরণই জাতীয়তাবাদ। বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-আদিবাসীদের সঙ্গে সভ্য ও মানবিক আচরণ করতে পারাটাই জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ। কারণ সভ্য ও মানবিক আচরণ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সামনে প্রদর্শন করে; হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-আদিবাসীদের সঙ্গে অমানবিক কিছু করলে সভ্যতার সম্মানের অযোগ্য হয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
সরকার যেহেতু রোহিঙ্গা শরণার্থী পুনর্বাসনের কাজটি করছে; এই কাজে সরকারের নির্দেশাবলী পালন করাটাই সরকারকে সাহায্য করা। এই পুনর্বাসন কাজের মাঝে রাজনীতি-ভোট খোঁজা অপ্রয়োজনীয়। এরকম জাতীয় সংকটকালে যারা রাজনীতি-ভোট খোঁজে তারা জনগণের কাছে সম্মান হারাবে। শরণার্থী রোহিঙ্গাদের ইস্যুটি কেবলই মানবিক; এখানে ধর্ম কিংবা রাজনীতির লাভজনক দোকান খোলার চেষ্টা অমানবিকতা।
গোটা বিশ্বমানবতা যেভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থী পুনর্বাসনে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে; তাতে শরণার্থী ব্যবস্থাপনা সুশৃংখল করতে পারলে আর্থিক ও অন্যান্য ত্রাণ সহযোগিতার অভাব হবার কথা নয়। মায়ানমারের গণহত্যার এপোলজিস্ট চীন-ভারতও যেখানে নিজেদের পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট অবস্থান শোধরাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণসাহায্য পাঠিয়েছে; তাতে বোঝা যায় সময় বাংলাদেশের অনুকূলে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি; সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। ফলে বাংলাদেশ মায়ানমারের কোন যুদ্ধের সস্তা উস্কানীকে গ্রাহ্য করবে না; যা করার তা বিশ্বসভায় সংলাপের টেবিলে করবে এটা সুনিশ্চিত। মনে রাখা দরকার, যে জাতিসংঘ অধিবেশনে মুখ দেখানোর উপায় না থাকায় মায়ানমারের অপরাধী নেত্রী অন সান সুচি যোগ দিচ্ছেন না; বাংলাদেশের মানবিক নেত্রী শেখ হাসিনা সে বিশ্বসভায় কথা বলতে যাচ্ছেন, সোনালী হৃদয়ের মানুষ হিসেবে; সুতরাং ডিপ্লোম্যাসিতে বাংলাদেশের জয় অনিবার্য।

লেখক সাংবাদিক ও শিক্ষক

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.