বঙ্গবন্ধু: বিষন্ন আলোয় বিনম্র শ্রদ্ধায়

430

এ বছরের শুরুর দিকের কথা, আমি তখন ঢাকায়। হঠাৎ মোবাইলে অপরিচিত নম্বর থেকে একটা ফোন এলো, ধরলাম। ও প্রান্তে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বর্তমানে প্রেষণে কেন্দ্রীয় কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করার ব্যাপারে আলাপে আগ্রহী, আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।

কারাগারের ব্যাপারে অনেকের মতো আমারও একটা আগ্রহ আছে। ঢাকা মেডিকেলে অধ্যয়নকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের খুব কাছেই বকশীবাজারের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হলে থাকতাম। আমাদের ছাত্রজীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে। প্রায়ই আমাদের রাজপথের সঙ্গী কেউ না কেউ গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসতেন। মাঝেমধ্যে মেডিকেলের ছাত্রদেরও কেউ কেউ গ্রেপ্তার হতেন। আমাদের তখন দায়িত্ব পড়তো কারাগারের অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় আর কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে দিয়াশলাই পৌঁছে দেওয়া। কারাগারের বাইরের ছোট গেট দিয়ে অফিসে ঢুকতাম। সামনেই আরেকটা গেট ছিল। সেটা দিয়ে বন্দীরা কারাগারের ভেতরে ঢুকতো।

ফোনে বললাম, আমিই আপনার অফিসে আসবো, তবে একটা শর্ত আছে। কী শর্ত? ফোনের অপরপ্রান্তে জানতে চাইলেন তিনি। বললাম, আমাকে ঢাকার পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারটি ঘুরে দেখাতে হবে। আমি দেখতে চাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কারাগারের কোথায় রাখা হতো? তিনি তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়ে গেলেন।

নির্দিষ্ট দিনে অনুজসম আজাদকে সঙ্গে নিয়ে বকশীবাজারে কারাগারের অফিসে পৌছালাম। আমি আসব এটা মনে হয় সবখানেই বলা ছিল। গেট থেকে নেমে নিজের পরিচয় দিতেই ভিআইপি অভ্যর্থনা শুরু হলো। ভদ্রলোক নিজেই অফিসরুমের বাইরে এসে আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। তারপর সদলবলে গাড়িতে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। একের পর এক বন্ধ দরজাগুলো খুলে গেলো, আমরা পুরোনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করলাম।

শুরুতেই গেলাম বঙ্গবন্ধুকে যেখানে বন্দী করে রাখা হতো সেখানে। ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটা পড়ে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের একটা ছবি মনে মনে এঁকে রেখেছি। বঙ্গবন্ধুকে কারাগারের একপাশে আলাদা একটা সেলে রাখা হতো। সেখানে স্নান এবং রান্নার জন্য আলাদা জায়গা ছিল। বঙ্গবন্ধু একজোড়া হলুদ পাখি পুষতেন। কারাগারে তাঁর ব্যবহার্য্য জিনিষপত্রগুলো খুব যতœ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কাছ থেকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন যেন করে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সেলের সামনে এক টুকরো বাগান, অনেকরকমের গাছগাছালিতে ভরা। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নিজহাতে লাগানো একটা গাছও আছে। কিছুক্ষণ গাছটাকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সঙ্গে ক্যামেরা ছিল, ছবি তোলার অনুমতিও ছিল। সেখান থেকে গেলাম আরেকটা ঘরে, যেখানে বঙ্গবন্ধু তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেন। সেই ছোট্ট টেবিলটা এখনো আছে। ছোট্ট রাসেল সোনা সেই টেবিলের ওপরে উঠে দাঁড়াতো, সাক্ষাতশেষে যেতে চাইতো না। শেখ রেহানাও খুব মনখারাপ করতেন। বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা ও পরিবারের অন্যান্যরা বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে দেখতে আসতেন। আমি দাঁড়িয়ে কল্পনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেখার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের স্থপতি, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা, আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার রাজনৈতিক জীবনে কী কষ্টটাই না করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন-যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো তার কেটেছে কারান্তরালে। অথচ স্বাধীন দেশের কিছু কুলাঙ্গার আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করতে চায়। সময়ের পরিক্রমায় যদিও তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আপন মহিমায় পৃথিবীর বুকে আজও সমুজ্জ্বল।

সেখান থেকে আমরা গেলাম জাতীয় চার নেতা শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ,ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে যেখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। চত্বরে ঢুকতেই জাতীয় চার নেতার আবক্ষমূর্তি চোখে পড়ে। প্রতিবছর ৩ নভেম্বর সেখানে চার নেতার পরিবারের সদস্যরাসহ অন্যান্যরা গিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। তাদের সেলের লোহার গেটে এখনো গুলির দাগ লেগে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে তাঁদের ব্যবহৃত খাট, টেবিলসহ সকল জিনিষপত্র সযতেœ সংরক্ষণ করা হয়েছে। কারাগারে যেখানে বন্দীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে ভীরু-কাপুরুষের দল রাতের অন্ধকারে কারাগারে ঢুকে পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর আমাদের জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল। মনের অজান্তেই সেই রাতের ঘাতকদের প্রতি একরাশ ঘৃণা ও ক্ষোভ জেগে ওঠে। ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুরো কারাগারটাই আমরা ঘুরে দেখলাম। কোথায় রান্না হতো, কোথায় ফাইল বসতো, আমদানি রুম, হাসপাতাল, মহিলা ওয়ার্ড, একে একে সব জায়গাতে গেলাম। সঙ্গে সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা। ভেতরের বেকারিটা এখনো চালু আছে, সেখানে নানা রকমের বিস্কুট বানানো হচ্ছে। আমাদের জন্য কয়েক প্যাকেট বিস্কুট উপহার হিসেবে দেওয়া হলো। কারাগারের ভেতরে কম্বল তৈরির ফ্যাক্টরিও ছিলো।

কারাগারের একপ্রান্তে ফাঁসির আসামীদের জন্য কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত সারিবদ্ধ কনডেমড সেল। একজন ফাঁসির আসামী দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শুধুমাত্র চৌবাচ্চার পানিতে গোসলের জন্য আধঘণ্টার মতো কনডেমড সেলের বাইরে থাকে। বাকিটা সময় খুবই স্বল্পপরিসর ওই কনডেমড সেলে। ফাঁসির রায় ঘোষণা থেকে কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ওই কনডেমড সেলে থাকলে যে কোনো কয়েদিরই অর্ধমৃত হয়ে যাওয়ার কথা। আট নম্বর কনডেমড সেলের সামনে এসে জানলাম, এই সেলে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী থাকতো। এর পাশেই ফাঁসির মঞ্চ, যেখানে নিজামীসহ অন্য অনেক যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। আমাকে যিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তিনি নিজে নিজামীর ফাঁসির সময় মঞ্চের কাছে উপস্থিত ছিলেন। তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন। বললেন, যে মুহূর্তে পায়ের নীচের পাটাতন সরে যায়, তখনি ফাঁসিতে ঝোলা আসামীর শরীর নিচে পড়ে চোখের আড়ালে চলে যায়।  আমাদের অনেকের ধারণা দেহটা হয়তো তখনও চোখের সামনে দড়িতে ঝুলতে থাকে। আসলে তা নয়, শরীরটা নিচে ঝুলতে থাকে। সেখান থেকে পরে বের করা হয়।

গত বছর কয়েকদিনের জন্য এই পুরোনো কারাগারটা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। পরে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির দায়িত্ব হলো ভবিষ্যতে এই কারাগারটি নিয়ে কী করা যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করা। কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীও হয়েছিল। ছবিগুলো তখনো দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনেক দূর্লভ ছবিই সেখানে শোভা পাচ্ছিল। সংগ্রামের দীর্ঘ বন্ধুর পথ পেরিয়েই শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন, বাঙালি জাতির জনক হয়েছিলেন; বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ছবিগুলো যেন সেই ইতিহাসেরই কথা বলছিল।

কারাগার পরিদর্শন শেষে বের হওয়ার সময় ভাবছিলাম, কী অদ্ভুত আমাদের রাজনীতির গতিপথ। যে কারাগারে পাকিস্তানি শোষকরা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে বছরের পর বছর বন্দী করে রেখেছিল, সেই কারাগারেই পাকিস্তানের দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদাদের ফাঁসি হয়েছে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এদেশের ঘাতক-কুলাঙ্গার ‘পাকি-ছানা’রা পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর কীর্তির মধ্য দিয়েই অমরত্ব লাভ করেছেন। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে উচ্চারিত হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক কবি, অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.