‘ফাইভ জি’ বাস্তবতা নাকি অতিরঞ্জন

257

‘থ্রি জি’ বা ‘ফোর জি’ নয়, বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনা চলছে ‘ফাইভ জি’ নিয়ে। দ্রুতগতির এই নেটওয়ার্ক নিয়ে মোবাইল অপারেটররাও প্রচার শুরু করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ৫জি সেবা চালুর ঘোষণাও দিয়েছে। কিন্তু ৫জি সেবা দেওয়ার বিষয়টা কি এতটাই সোজা? অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, মোবাইল অপারেটররা ৫জি চালুর নামে যা প্রচার করছে তা কেবল ‘ভাঁওতাবাজি’। ৫জির নামে যা চালু হয়েছে তা বস্তুত ফোরজি এলটিই প্রযুক্তির উন্নত ও দ্রুতগতির সংস্করণ। মোবাইল অপারেটরদের প্রচারসর্বস্ব বিজ্ঞাপনে অতিষ্ঠ হয়ে শেষপর্যন্ত খোদ জাতিসংঘকেই বিষয়টিতে নাক গলাতে হচ্ছে।
মোবাইলের দুনিয়ায় প্রতিটি ‘জি’-এর অর্থ জেনারেশন বা প্রজন্মকে বোঝায়। প্রতিটি ‘জি’ বা প্রজন্ম যখন চালু করতে হয়, তখন প্রযুক্তিবিশ্বকে কতগুলো বিষয়ে একমত হতে হয়। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়ন (আইটিইউ) সংস্থাটির দায়িত্ব হচ্ছে, এ নেটওয়ার্কের মান ঠিক করা। সম্প্রতি আইটিইউ ৫জি-এর যে মান নির্ধারণ করেছে, তাতে যে মোবাইল অপারেটরগুলো ৫জি সেবা দেওয়ার দাবি করেছে তা ভুয়া বলেই প্রমাণ হয়েছে।
এটিঅ্যান্ডটির ‘৫জি ইভোলিউশন’ এই মানের কাছাকাছি যায় না। এমনকী ভেরিজনের দাবির সঙ্গেও এই মানের মিল হয় না। এ দুটি নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফোরজি প্রযুক্তির মধ্যে তথ্য স্থানান্তরের হার বাড়িয়ে ৫জি বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তথ্য স্থানান্তরের গতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ৫জি শুধু গতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ৫জি মানে আরও অনেক কিছু।
৫জি তাহলে কী? ৫জির সংজ্ঞা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তাই বাস্তবিকই এখনো কেউই জানে না, এর কাঠামো কেমন হবে। তবে, আইটিইউয়ের বিশেষজ্ঞরা ৫জির পারফরম্যান্সের প্রয়োজনীয় কয়েকটি বিষয়ে একমত হয়েছেন। যার মধ্যে শুরুতেই আছে- কল ড্রপের বিষয়টি। ৫জিতে কেনো কল ড্রপ হবে না। ৫জি নেটওয়ার্কের টাওয়ার বদল করা হলেও কল ড্রপ বা ইন্টারনেট সংযোগের কোনো পরিবর্তন হবে না। আইটিইউয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫জি নেটওয়ার্কের মোবাইলে ব্যাঘাত বলে কিছু থাকবে না। যদি কোনো সমস্যা হয় তবে তা ৫জি বলে গণ্য হবে না।
কল ড্রপের পর আছে কম ল্যাটেন্সির বিষয়টি। ৫জি ফোনে ল্যাটেন্সি ৪ মিলিসেকেন্ড থেকে ১ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে থাকতে হবে। ল্যাটেন্সি মিলিসেকেন্ডে হিসাব করা হয়। ল্যাটেন্সি হচ্ছে মোবাইল ফোনের সংকেত ইন্টারনেট সার্ভারে পৌঁছানোর সময়। ফোর জিতে ল্যাটেন্সি ৫০ মিলিসেকেন্ড। ল্যাটেন্সি কম হলে অগমেন্টেড রিয়্যালিটি, স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মতো বিষয়গুলো উন্নত হবে।
৫জিতে ব্যাটারির চার্জ কম ফুরাবে। সাধারণত ডেটা ব্যবহারের সময় মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হতে দেখা যায়। ৫ জি’তে ব্যাটারির দক্ষতা বেড়ে যাবে। ফোন যখন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে না তখনকার সিøপ মোড ফিচারটি উন্নত হবে।
দ্রুতগতিতে চলার সময়েও ভালো কাজ করবে ৫জি। গতি যদি ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয় তবুও ৫জি দুর্দান্ত কাজ করবে। বর্তমানে গাড়ি যদি দ্রুত চলে তখন মোবাইল দ্রুত টাওয়ার পরিবর্তন করে। দ্রুত চলার সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ করে না। ৫জিতে এই সমস্যা থাকবে না।
৫জি নেটওয়ার্কে ডাউনলোডের গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবিটস। আপলোড গতি হবে সেকেন্ডে ৫০ মেগাবিটস। অর্থাৎ, নেটফ্লিক্সের এক ঘণ্টার এইচডি মানের অনুষ্ঠান মাত্র চার মিনিটেই ডাউনলোড করা যাবে। আইটিইউ ‘পিক ডাটা রেটস’ ও ‘এক্সপেরিয়েন্সড ডাটা রেটস’-এর মধ্যে পার্থক্য বলে দিয়েছে। পিক ডাটা রেটস হচ্ছে পরীক্ষাগারে সর্বোচ্চ তথ্য স্থানান্তরের হার আর এক্সপেরিয়েন্সড ডাটা রেটস হচ্ছে বাস্তবে তথ্য স্থানান্তরের গতি। ৫জি’তে পিক ডাটা রেটস হবে প্রতি সেকেন্ডে ২০ গিগাবিটস ডাউনলিংক ও সেকেন্ডে ১০ গিগাবিটস আপলিংক। এখনো পর্যন্ত পরীক্ষাগারে ফিনল্যান্ডের নকিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ডাউনলিংকের গতি ১০ গিগাবিটস ও আপলিংকের গতি সাড়ে ৭ গিগাবিটস পর্যন্ত অর্জন করতে পেরেছে। যা ৫জির ধারেকাছেও নয়।
চিপ নির্মাতা ইনটেল ও টেলিকম যন্ত্রপাতি নির্মাতা এরিকসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে ২০২০ সালের আগে ৫জি আসার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সাল নাগাদ ৫জি সুবিধার যন্ত্র দেখা যেতে শুরু করবে। অবশ্য আইটিইউ ৫জির জন্য ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সংজ্ঞা নির্ধারণের সময় ঠিক করে রেখেছে। তাই ৫জির সংজ্ঞাতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
মোবাইল বিশ্ব সাধারণত নেটওয়ার্কের একটি চক্র মেনে চলে। ১০ বছরের এই চক্র ২০২০ সালে পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্কের জন্য পূর্ণ হবে। ১৯৮২ সালে প্রথম ১জি নেটওয়ার্ক চালু হয়েছিল। ১৯৯১ সালে চালু হয়েছিল ২জি। ২০০০ সালে আসে থ্রিজি আর ২০১০ সালে ফোর জি’র যাত্রা শুরু হয়। সে বিষয়ে ২০২০ সাল ৫জির জন্য প্রকৃত সময়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মোবাইল অপারেটররা অবশ্য ২০১৯ সালের মধ্যেই ৫জি নেটওয়ার্ক চালু করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউরোপের নেটওয়ার্ক সেবাদাতারা ২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি করে শহরে ৫জি চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
৫জি নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে ২৮ গিগাহার্টজ, ৩৭ গিগাহার্টজ ও ৩৯ গিগাহার্টজ ব্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ, ৫জি ৩০ গিগাহার্টজ ব্যান্ড থেকে শুরু হবে অর্থাৎ, এটি মিলিমিটার তরঙ্গের সুবিধা নিতে পারবে। বর্তমানে ফোরজি নেটওয়ার্ক ৭০০ মেগাহার্টজ থেকে ২১০০ মেগাহার্টজের মধ্যে কাজ করে। মেগাহার্টজের চেয়ে গিগাহার্টজ হাজার গুণ শক্তিশালী। এতে দ্রুতগতিতে তথ্য স্থানান্তর করা সম্ভব। মিলিমিটার ওয়েভ ব্যবহারের কারণে অ্যানটেনার আকার আরও ছোটো হবে। ফলে স্মার্টওয়াচ কিংবা স্মার্টগ্লাসের মতো পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি ৫জি সংযোগ পাবে।
ফাইভ জি’র সুবিধা:
দ্রুতগতির ডাউনলোড ও আপলোড সুবিধা, চলন্ত অবস্থায় উন্নত ভিডিও কল, ফোনে বেশিক্ষণ চার্জ, দ্রুত ডেটা লোড ও অগমেন্টেড রিয়্যালিটি, রিয়্যাল টাইম ফোর কে মানের স্ট্রিমিং ও ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি অভিজ্ঞতা, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিপণ্যে ইন্টারনেট, অধিক আইওটি (ইন্টারনেট সুবিধার পণ্য) যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি, সাশ্রয়ী মোবাইল প্রযুক্তি।
তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.