তিন বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন মাইলফলক

737

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগের ঘটনা ঘটেছে গত অর্থবছরে। প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি এক নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে। মূলত দেশটির বিদ্যুৎখাতে নতুন করে চীনের বিনিয়োগ আসার কারণেই এফডিআই বেড়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগ তিনগুণের বেশি বেড়েছে বলেই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুইশ ৯৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ১৯ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দুইশ ৫০ কোটি ২০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে একশ ৭০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এটি

আগের বছরের তুলনায় ৩২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। আর ওই বছরে নিট এফডিআই ছিল একশ ২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। নিট এফডিআই হিসাব করা হয় মূলত এক অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেন তা থেকে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ফেরত নিয়ে যান, সেটি বাদ দিয়ে। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ ফেরত নেন, আবার ঋণ পরিশোধের জন্যও অর্থও নেন। গত অর্থবছরে শেয়ার- বাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে ৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
অবশ্য, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি রেকর্ড বিবেচিত হলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিমাণ বিনিয়োগ বাংলাদেশের বিনিয়োগ চাহিদার বাস্তবতার জন্য যথেষ্ট নয়।
২০১৬-১৭ অর্থবছরের এফডিআইয়ের পরিমাণ জিডিপির অনুপাতে এক শতাংশের সামান্য কিছু বেশি। কিন্তু সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জিডিপির ৩ শতাংশ এফডিআই আনার যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেই হিসাবে তিন বিলিয়ন ডলারের এই বিদেশি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ; যেমন ভারত বা পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কম। অর্থনীতিবিদরা এই বাস্তবতায় আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে, একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খুব দ্রুত গুরুত্ব দিয়েই আশু সমাধান খোঁজা উচিত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তা হচ্ছে, গত অর্থবছরে পণ্যবাণিজ্যের ক্ষেত্রে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত ৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থবছরের শেষদিকে রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই ঘাটতির সৃষ্টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ সর্বমোট চার হাজার তিনশ ৪৯ কোটি ১০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। আমদানি বেড়েছে ৯ শতাংশ।
কিন্তু এই সময়ে রপ্তানি আয় (ইপিজেডসহ) হয়েছে তিন হাজার ৪০১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে নয়শ ৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।
বিদেশি বিনিয়োগের বাস্তবতা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি, পরিবেশ, দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে এখনও ঝুঁকি রয়েছে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর বাস্তবতায় বর্তমানে অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে বাংলাদেশের মতো বাজারগুলোতে এমন বিনিয়োগ বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকেই
এখন চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ সম্ভাবনাময় নতুন দেশগুলোতে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই একটি অংশ এখন বাংলাদেশে আসছে। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের এফডিআই বেড়েছে।
পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন করে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনসহ আরও বেশকিছু বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা এফডিআই আকর্ষণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
এদিকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে চীন থেকে অনেক বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। যেমন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চীন থেকে রেকর্ড পরিমাণ ৬১৭ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যার বেশকিছু অংশ বাস্তবায়িতও হয়েছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোক্তারা কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিবন্ধন নিয়েছেন। বাংলাদেশের এসব সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতাটি ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিকরা।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.