ডেটা এখন ডিজিটাল যুগের ‘তেল’!

278

আগে জমজমাট ছিল তেলের ব্যবসা আর এখন সেই তেলের জায়গা নিচ্ছে ডেটা বা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এখন ডেটা বা তথ্যের ব্যবসাই হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর লাভজনক ব্যবসা। এর কল্যাণেই ফুলে-ফেঁপে উঠেছে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। গড়ে উঠেছে ডেটা অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত দেশেরও চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে ডেটা ব্যবসানির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের এই ক্ষমতার উৎস তেল নয়, বরং অঢেল তথ্য!
২০ শতকের জমজমাট ব্যবসা বলতে সবাই তেলের ব্যবসাকেই বুঝতেন। বড় বড় চুক্তি আর একচেটিয়া বাজার দখল করে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল তেলের ব্যবসা। ওই সময় তেলই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু তেলের সেই দিন আর নেই! দিন এখন ডেটার। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ধরা হচ্ছে ডেটাকে। ফলে যাঁদের কাছে অঢেল ডেটা আছে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। আগে ঠিক তেল ব্যবসায়ীদের নিয়ে এই দুশ্চিন্তায় থাকতে থাকতে হতো। এখন ডেটা যেন ডিজিটাল যুগের তেল!
যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠানের কথাই ধরা যাক। অ্যালফাবেট (গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান), আমাজন, অ্যাপল, ফেসবুক আর মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অপ্রতিরোধ্য এক গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বের শীর্ষ মূল্যবান প্রতিষ্ঠানের তালিকা করলে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠান নিশ্চিন্তে স্থান পাবে। দিন দিন এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফাও বেড়ে চলেছে। এ বছরের প্রথম প্রান্তিক বা প্রথম তিন মাসের কথাই ধরা যাক। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠান মিলে গড় মুনাফা করেছে দুই হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে যত অর্থ খরচ করা হচ্ছে তার অর্ধেকই যাচ্ছে আমাজনের পকেটে। গত বছরে আমেরিকায় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের বেশির ভাগ আয় করেছে গুগল আর ফেসবুক। সব মিলিয়ে ডেটার ব্যবসায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একক আধিপত্য।
প্রতিষ্ঠানগুলোর এই একচেটিয়া আধিপত্যের বিষয়টি অ্যান্টি-ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্বেগে ফেলছে। একচেটিয়া ব্যবসা যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তারই চেষ্টা করছে অ্যান্টি-ট্রাস্ট। আর তাই একচেটিয়া ‘দানব’ হয়ে ওঠা কোম্পানিগুলো ভেঙে দেওয়ার জোর দাবি উঠছে। ২০ শতকের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত মার্কিন তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড ওয়েলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিলেই কী এই সমস্যার সমাধান হবে? আর প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে ওঠাটাই কী অপরাধ?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে অ্যান্টি-ট্রাস্টের দুর্বলতাই চোখে পড়বে। কারণ, প্রতিষ্ঠান বড় হওয়াটা অপরাধ নয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহককে বিনা মূল্যে সেবা দিচ্ছে, গ্রাহক সুবিধা বাড়াচ্ছে। যদিও এর বিনিময়ে তথ্য নিচ্ছে এরা। আবার, অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী গুগল- মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানকে ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে না। স্ন্যাপচ্যাটের মতো নতুন প্রতিষ্ঠানও উঠে আসতে পারছে। তাই প্রতিষ্ঠান বড় হলে উদ্বেগের তেমন কিছু নেই। তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্নকথা। ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আছে তথ্য। তাদের হাতে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা দিন দিন বিশাল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাই পুরোনো তেলের যুগের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো করে এখনকার বিষয়টি বিবেচনায় করা যাবে না। ‘ডেটা অর্থনীতির’ এ যুগে দরকার আরও আধুনিক পদ্ধতি। গত কয়েক দশকে ডেটা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। সবখানেই তথ্য। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আসায় তথ্য যেন অবাধ ও অঢেল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ডেটার মূল্য। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সবাই একটা চিহ্ন বা ছাপ রেখেই চলেছেন। এতে তথ্য সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলোর পোয়াবারো। তারা নতুন কাঁচামাল পেয়ে যাচ্ছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে স্মার্টঘড়ি, স্মার্টকার। এতে ইন্টারনেট সুবিধা থাকছে। ফলে তথ্য আরও বাড়ছে।
পাশাপাশি, প্রচুর তথ্য হাতে থাকার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলেছে। তারা গ্রাহকের ওপর নেটওয়ার্ক প্রভাব খাটায়। ফেসবুকে যেমন একজন ব্যবহারকারী ঢুকলে তার নেটওয়ার্কে থাকা অন্যরা আকৃষ্ট হন। ডেটা হাতে থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নেটওয়ার্কের প্রভাব খাটাতে পারছে ইচ্ছেমতো। কারণ, যত বেশি তথ্য তত বেশি উন্নত সেবা। এতে ব্যবহারকারী আরও বেশি। উদাহরণ মার্কিন গাড়িনির্মাতা কোম্পানি টেসলা। তাদের স্বয়ংক্রিয় গাড়ি তথ্য সংগ্রহ করে। যত বেশি তথ্য দেওয়া হবে এর সেবা তত উন্নত হবে। সে হিসেবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মাত্র ২৫ হাজার গাড়ি বিক্রি করেও মূল্যবান প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেনারেল মটর্সকে টপকে গেছে টেসলা। এদিকে, ২৩ লাখ গাড়ি বিক্রি করেছে জেনারেল মটরস। বিশাল তথ্যভা-ার এভাবেই প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা অর্থনীতির পুরোপুরি সুবিধা নিতে অনলাইন জুড়ে নজরদারির সব ব্যবস্থাও করে রেখেছে। যেমন, মানুষের অনুসন্ধানের তথ্য আছে গুগলের কাছে, ফেসবুকের কাছে আছে শেয়ারের তথ্য, মানুষের কেনাকাটার অভ্যাসের তথ্য আছে আমাজনের কাছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই নিজস্ব অ্যাপ স্টোর, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটিং প্রযুক্তি ভাড়ার ব্যবসা করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তে না দেওয়ার বিষয়টি। বিশাল তথ্যভান্ডার হাতে থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বাজার যেমন সহজে বুঝতে পারে; তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের আটকানোর ব্যবস্থাও করতে পারে। নতুন কোনো সেবা বা পণ্য যখন জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন তারা সেটা নকল করে ফেলে। তাতেও কাজ না হলে প্রতিষ্ঠানটিকেই কিনে নেয়। উদাহরণ, হাতের নাগালেই; ফেসবুকের হোয়াটসঅ্যাপকে কেনার ঘটনাটিই একটি বড় উদাহরণ। তবে কি অ্যান্টি-ট্রাস্ট ছাড়া উপায় নেই? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অ্যান্টি-ট্রাস্ট ওষুধ প্রয়োগে তথ্যের প্রভাব খাটানোর এ গতিপ্রকৃতি বদলানো যাবে না, প্রথাগত চিন্তা বদলাতে হবে। এক্ষেত্রে দুটি পথই খোলা আছে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা হবে বা কেনা হবে তখন প্রতিষ্ঠানের আকার বিবেচনা না করে, ডেটা বা তথ্য-সম্পদ বিবেচনা করতে হবে। নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘দানব’ প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে হুমকি না হয় তা দেখতে হবে। চুক্তির সবদিক বিবেচনা করে সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ হতে চাপ দিতে হবে। গ্রাহকের সংগৃহীত তথ্য এবং তা থেকে প্রকৃত আয়ের তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
তথ্য-প্রযুক্তির যুগে অ্যান্টি ট্রাস্ট নতুন করে চালু করা সহজ কাজ নয়। তাতে নতুন ঝুঁকিও আসতে পারে। তথ্য বিনিময় বেড়ে গেলে হুমকিতে পড়বে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কাছে ডেটা অর্থনীতির আধিপত্য যদি সরকার রাখতে না চায়, তবে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সত্যি বলতে কী, এর জন্য সময় বড় কম।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.