টেস্ট লিগের সুফল পাবে বাংলাদেশ?

402

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে মাত্র ১০টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা ১২টি করে; ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৩টি এবং শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান ১৪টি করে টেস্ট খেলেছে। ওই ৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৬টি টেস্ট খেলেছে নিউজিল্যান্ড।
২০১৬ সালের শুরু থেকে ২০১৭ সালের মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২১টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে ইংল্যান্ড। একই সময়ের মধ্যে ২০টি ম্যাচ খেলেছে ভারত; ১৮টি করে ম্যাচ খেলেছে অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা।
এ ছাড়া, শ্রীলঙ্কা ১৭টি; পাকিস্তান ১৫টি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড ১৪টি করে টেস্ট ম্যাচ খেলেছে। টেস্ট খেলার তালিকায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ৯টি এবং জিম্বাবুয়ে ৫টি ম্যাচ খেলেছে।
টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েও পর্যাপ্ত সাড়া পায়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। টাইগারদের বিপক্ষে টেস্ট, ওডিআই ও টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলতে অনেক সময়ই অনীহা প্রকাশ করেছে টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলো। বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচ আয়োজন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আইসিসির উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালের ওডিআই বিশ্বকাপের পর টেস্ট লিগ চালু করতে যাচ্ছে আইসিসি। বাংলাদেশসহ টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের প্রথম ৯টি দল এই লিগে অংশ নিতে পারবে। আর ৪ বছরে কমপক্ষে ১২টি টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে প্রতিটি দল।
এবছরের জুন মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আইসিসির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বছরের অক্টোবর মাসে আইসিসির পরবর্তী সভায় এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আর এটি চূড়ান্ত হলে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে কমপক্ষে ১২টি টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ।
আইসিসির সভায় টেস্ট লিগের অনুমোদন দেওয়া হলে ২০১৯ সাল থেকে পরবর্তী ৪ বছরে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের সঙ্গে হোম এবং অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এছাড়া একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অ্যাওয়ে টেস্ট খেলবে টিম টাইগার।
আইসিসির টেস্ট লিগের সেরা দুইটি দল হোম ও অ্যাওয়ে ভিত্তিতে টেস্ট খেলবে। তাদের মধ্যে জয়ী দলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে। এই সূচির বাইরে যেকোনো দুইটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে টেস্ট সিরিজ আয়োজন করতে পারবে। প্রস্তাব অনুমোদন পেলে টেস্ট স্ট্যাটাস থাকা অন্য ৩টি দল জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান এই টেস্ট লিগের বাইরে থাকবে। এর মধ্যে অন্য যেকোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে টেস্ট ম্যাচ খেলতে নির্দেশনা দিয়েছে আইসিসি।
আইসিসি নির্ধারিত টেস্ট লিগের সূচিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো টেস্ট রাখা হয়নি। তবে দুই দেশের সম্মতিতে টেস্ট সিরিজ আয়োজন করতে পারবে উভয় দল।
একইভাবে, টেস্ট লিগে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দলই লিগের বাইরে নিজেদের মধ্যে এবং আইসিসির অন্য ৩টি পূর্ণ সদস্য দেশের বিপক্ষেও টেস্ট সিরিজ আয়োজন করতে পারবে। অর্থাৎ, টেস্ট লিগ চালু হলে লিগের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দলেরই টেস্ট খেলার পরিমাণ বাড়বে। আইসিসির এমন ইতিবাচক উদ্যোগের বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার পরিমাণ কী আনুপাতিক হারে বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর কী হবে, তা হয়তো আইসিসি বা বিসিবিও এমুহূর্তে দিতে পারবে না।
বাস্তবতা হচ্ছে, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং পাকিস্তান বর্তমানে নিজেদের মধ্যে টেস্ট সিরিজের আয়োজন করে। টেস্ট লিগ চালু হওয়ার পরও তাদের এই সিরিজ চলমান থাকবে। অর্থাৎ, ৪ বছরে লিগে কমপক্ষে ১২ টেস্ট খেলার পরও নিজেদের সুবিধা মতো সময়ে আলাদা টেস্ট সিরিজের আয়োজন করবে তারা।
বর্তমানে টাইগারদের যেভাবে অবহেলা করা হচ্ছে- টেস্ট লিগ চালুর পরও তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচ আনুপাতিক হারে বাড়বে না। আবার তুলনামূলক কম পরিমাণ টেস্ট খেলার কারণে লিগের ম্যাচেও ভালো করতে পারবে না টাইগাররা। অর্থাৎ আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর অবহেলা চলতে থাকলে টেস্ট লিগ বাংলাদেশের জন্য কোনো সুখবর নিয়ে আসবে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশের হোম কন্ডিশন টেস্টের জন্য কতটা উপযোগী- তা নিয়েও বেশ বিতর্ক রয়েছে। ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলার উন্নয়নে বর্তমান সরকার স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেও সেগুলোর সঠিক পরিচর্যার অভাব রয়েছে। গত কয়েক বছরে নতুন করে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব লক্ষণীয়। বছরের বেশিরভাগ সময় কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ না থাকায় অনেকটা জনশূন্য হয়েই পড়ে থাকে স্টেডিয়ামগুলো।
বর্তমানে বিপিএলের মতো টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট লিগের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে ওই লিগের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে এবং চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। এ ছাড়া ফতুল্লা, সিলেট, খুলনা, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি হলেও সেগুলোতে ম্যাচের আয়োজন খুব একটা হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ওই স্টেডিয়ামগুলোর কার্যক্ষমতাও নষ্ট হবে। একটা সময় টেস্ট খেলার উপযোগিতাও হারাবে উইকেটগুলো।
তবে ক্রিকেটের উন্নয়নে যেমন স্টেডিয়াম বাড়ানো হচ্ছে, তেমনি করে নতুন প্রতিভা, তরুণ খেলোয়াড়দেরকেও তুলে আনার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বিসিবি ও সংস্থাটির সহযোগী সংগঠনগুলো। একইভাবে অবদান রাখছে বিসিবির স্পনসররাও। সব মিলিয়ে বলা যায়, টেস্ট র‌্যাংকিংয়েও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.