গোয়েন্দা গল্প | আঁকিবুকি

মুনির রানা

384

 

সাব ইন্সপেক্টরের শরীরখানা দশাসই। লম্বা-চওড়া। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখ দেখেই বোঝা যায় ঘুুম ঠিকমতো হয়নি। ডেস্কের সামনে ঝুঁকে দাড়িয়ে প্রথমে ভূমিকা করে নিল।
‘ডিআইজি সাহেব আপনার কাছেই পাঠালেন। বললেন, আগেও আপনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। আরেকবার যদি…।’
‘জজ সাহেবের কেস।’
‘জ্বী। পত্রিকায় দেখেছেন নিশ্চয়ই।’ বলতে বলতে বিশাল বপুটা নিয়ে আরাম কেদারায় বসে পড়লো পটল সরকার। ‘বিশাল গাড্ডায় পড়েছি বুঝলেন। কূল নাই কিনার নাই। আছে কেবল এই চিরকুট।’ বলে একটুকরো কাগজ ঠেলে দিলো বৈভবের দিকে। ‘দেখুন কিছু করতে পারেন কি না।’
ঠিক চিরকুট নয়, এ ফোর সাইজের চেয়ে লম্বায় কিছুটা কম হবে কাগজটা। কোন প্যাড থেকে টেনে ছেড়া হয়েছে। এক কোণে বলপয়েন্টের কিছু আঁকিবুকি, লেখা শুরুর আগে কাগজের কোনে যেমনটা করা হয়। কালি ঠিকমতো বের হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা আর কি।
‘এই নোটটুকুই পেয়েছি আমরা। আজ দুপুরেই মেইলে এসেছে।’ মুখ খুললেন পটলবাবু।
‘দুপুরে কখন?
‘১২টার দিকে। তাও একটা খবর মিলল। সেদিন সকালে কোর্টরুম থেকে গুন্ডাগুলো জজসাহেবকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তো কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না। এদিকে প্রেসের যন্ত্রণায় অস্থির…’
‘খুব গোলাগুলি হয়েছিল, না?’ হাতের কফিটা রেখে চিরকুটটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো বৈভব।
‘অ-নে-ক। জজ সাহেবকে নিয়ে রীতিমতো ব্রাশফায়ার করতে করতে বেরিয়ে গেছে ওরা।’
‘হুমম….’ চিরকূটের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল, ‘একটু খাপছাড়া লাগছে। একজন জজের পক্ষে এরকম…’
‘সেটাই তো আমাদের আরো ভাবিয়ে তুলেছে। জজকে তুলে নিয়ে গেছে জেলে আটক এক টপ টেররকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। এটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু সৌগত সাদমানের মতো একজন জজ ওরকম একটা নোট পাঠাবেন বলেও আমার বিশ্বাস হয় না। হয় তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, অথবা ভীষণ ভয় পেয়েছেন। আমি অবশ্য ওনাকে কখনোই ঘাবড়াতে দেখিনি।
বৈভব আবার পড়তে শুরু করে নোটটা-
‘যাহার জন্য প্রযোজ্য:
আমি, জজ সৌগত সাদমান, আদালতের একজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে এই মর্মে আদেশ করছি যে, কারাবন্দী পায়রা মাসুদকে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া হোক। আমার নিরাপদ মুক্তির স্বার্থে বিনাবিচারেই ওই বন্দীকে মুক্তি দিতে হবে। এই নোটকে আদালতের আদেশ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিচ্ছি আমি। এই মর্মে আরও সতর্ক করে দিচ্ছি, আমাকে যারা অপহরণ করেছে তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, রিসোর্সফুল, এবং ভয়ঙ্কর। বৃহস্পতিবার ৬টার মধ্যে যদি শর্তপূরণ করা না হয় তাহলে ৬টা ১ মিনিটের মধ্যে আমি লাশ হয়ে যাব।
আদেশক্রমে
জজ সৌগত সাদমান, সি.এস.আর’
নোটের উপরের দিকে তাকাল বৈভব। ভুরুতে ভাঁজ ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো।
এসআই পটল বৈভবের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করলো, বৈভবের মতো ভঙ্গি করে নোটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ। কিছু বুঝতে না পেরে ঠোঁট উল্টে একটা হতাশ ভঙ্গি করে হাতের ঘড়িটার দিকে তাকালো। বিকেল ৪টা। বৈভব আবার নোটটা হাতে তুলে নিল।
পটল সরকারের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে একটু অধৈর্য হয়ে পড়েছে। কিছু একটা বলতে গিয়েও গিলে ফেলল। বৈভবকে রাগানো যাবে না কোনভাবে। সেই এখন শেষ ভরসা। হাতে আর মাত্র ঘণ্টাদুয়েক সময় আছে। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করলো।
বৈভব দ্রুত নোটের ওপরের দিকটা একবার দেখে নিল, তারপর ডেস্কের ওপর রেখে আবারও ওল্টালো সেটা, বিভিন্ন কোণ থেকে পরীক্ষা করলো নোটটাকে।
পটলবাবু তার ওয়ালেট থেকে একট কলিং কার্ড বের করে সেটা দেখতে লাগল। কার্ডের সঙ্গে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণের মধ্যে একটুকরো কাগজ সাঁটানো আছে। পত্রিকার এই আর্টিকেল দেখেই বৈভবের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে সে। কার্ডের উপরে লেখা- ‘যখন আর দিশা পাচ্ছেন না, চলে আসুন’। এর নিচে ক্লিপিংয়ে লেখা- ‘…রহস্য ভেদ করতে মিস্টার বৈভব যেন এক অব্যর্থ যন্ত্র, এক নতুন ধারার বিশেষজ্ঞ তিনি, যাকে বলা হচ্ছে হিউরিস্টিশিয়ান। মিস্টার বৈভবের মতে, একজন হিউরিস্টিশিয়ান হচ্ছেন পেশাদার সমস্যা সমাধানকারী, যিনি অন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একত্রে কাজটা করেন। অধিকাংশ সমস্যাই, তিনি বলেন, প্রায় একইরকম টেকনিক বের করে সমাধান করা সম্ভব, যদি দরকারি বিশেষজ্ঞরা হাতের কাছে থাকেন।’
পটলবাবু কার্ডটা ওয়ালেটে ভরতে ভরতে দেখলেন বৈভব সাহেব নোটটা এবার ৪০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। কাগজের লেখার দিকে তার আর কোনো মনোযোগই নেই। বরং লেখার শুরুতে জজসাহেব যে আঁকিবুকি কেটেছেন সেটাই দেখছেন মনোযোগ দিয়ে।
ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলো পটল সরকারের।‘শুনুন,’ বললেন তিনি, ‘জজসাহেব কী কলম দিয়ে নোটটা লিখেছেন সেটা জানার জন্য কিন্তু আপনার কাছে আসিনি। যদি পারেন এ নোট দেখে বলুন উনি কোথায় আছেন, তার কোনো ক্লু মেলে কি না।’
পটলের কথা ক্ষেতেই পড়ে থাকলো, বৈভব কানেই তুললেন না। ইন্টারকমের বাটন টিপে ডাকলেন, ‘সাজি?’
‘জ্বী ভাইয়া।’
‘একটু ভিতরে আসতে পারবে।’
‘আসছি।’
ইন্টারকম ছেড়ে পটলের দিকে তাকালেন। ‘আপনি তো বলছিলেন, জজসাহেব সহজে ভয়টয় পান না।’
‘আমি তাকে কখনো ভয় পেতে দেখিনি। কিছু কিছু মামলায় তার ওপর অনেক চাপ এসেছে। ঘুষের প্রস্তাব তো থাকতোই, রাজনৈতিক চাপ, উড়োচিঠি, খুনের ভয় দেখিয়ে ফোন… কোনোকিছুতেই বিচলিত হতে দেখিনি তাকে। বরং চাপ যতো কঠোর হয়েছে, তিনি ততই অনমনীয় হয়েছেন। তার যা করার তিনি করে গেছেন, কোন কিছুর পরোয়া না করে।’
‘ওনার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল কীভাবে? মানে আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম, জজিয়তি শুরুর আগে উনি কী করতেন?’ জানতে চাইলো বৈভব। ‘লেখাপড়া।’ ‘কোথায়?’ ‘ঢাকা ভার্সিটিতে। আইন বিভাগে।’ ‘আর কিছু?’
‘শুনেছি ছাত্রাবস্থায় একটা পত্রিকার হয়ে আদালত প্রতিবেদকের কাজও করেছেন কিছুদিন।’ বলতে বলতেই আরেকবার হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো পটল। ৪টা বেজে গেছে। আর মাত্র ২ ঘণ্টা। এর মধ্যেই যা করার করতে হবে। অথচ লোকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাগজ দেখে, উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করেই সময় পার করে দিচ্ছে। বিরক্তিটা চেপে রাখতে পারল না সে, ‘আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না, এসব কি আমাদের কোনো কাজে লাগবে? মানে, সময় কিন্তু বেশি নেই। ৬টার সময় ওরা জজ সাহেবকে খুন করে ফেলবে।’
‘অপহরণকারীরা কি জায়গা বদলাতে পারে? মানে যেখানে ওনাকে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে এই নোট পাঠিয়েছে, সেখান থেকে অন্য কোথাও সরে যেতে পারে? আপনার কি মনে হয়?’
একটু চিন্তা করে পটল বলল,‘রাস্তাঘাটে যে ট্রাফিক, তাছাড়া পুলিশ এখন সর্ব্বোচ্চ সতর্কাবস্থায়।… উঁহু, আমার মনে হয় না, ওরা জায়গা বদলের ঝুঁকি নেবে।’
দরোজায় দুটো টোকা পড়ল। অনুমতির অপেক্ষা না করেই সাজি শেহনাই ঢুকে পড়ল বৈভবের চেম্বারে।
পটলবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বৈভব বললেন, ‘জজসাহেবকে যেখানে আটকে রেখেছে ওরা, সে ঠিকানাটা হলেই তো আপনার চলে ?’ ‘জ্বী।’ ‘কিন্তু ওনাকে খুজে পাওয়ার একটাই উপায় এই চিঠি? আর কিছু তো নেই? তাই না?’ ‘ঠিক তাই?’ এবার সাজির দিকে ফিরলেন। আলতোপায়ে এরই মধ্যে টেবিলের কাছে চলে এসেছে সে। ডেস্ক থেকে ব্লটারটা নিয়ে নোটটা তার নিচে রাখলেন। তারপর নোটটা ঢেকে শুধু শুরুর আঁকিবুকি অংশটা একটু কোনাকুনিভাবে এগিয়ে দিলেন সাজির দিকে। ‘এটা পড়ো তো?’ বলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলেন একান্ত সচিবের দিকে? ডেস্কে হেলান দিয়ে সাজি শেহনাই মাথাটা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলো।
‘পূর্ব’ বলতে বলতে ভুরুটা একটু কোঁচকালো। ‘পূর্ব…পূর্ব…এরপরটা কি রাজ…নাকি রাজা…নাহ এটা একটা জায়গার নামই মনে হচ্ছে, কিন্তু পুরোনো স্টাইলে লেখা।’ আরেকবার মনোযোগ দিল সে, ‘মনে হচ্ছে পূর্ব রাজাবাজার।’ বলে একবার বৈভবের দিকে তাকালো সাজি। একটু ইতস্তত করে বললো,‘কিছু কিছু চিহ্ন দেখে কিছুই বুঝতে পারছি না। আগের স্টাইলে লেখা।’
‘কিন্তু এখানে একটা চিহ্ন দুবার দেখছি। আমার মনে হচ্ছে একটা দিক নির্দেশকই। সেক্ষেত্রে এটা পূর্ব রাজাবাজারই হবে। আমার মনে হচ্ছে এটা একটা ঠিকানা। পুরো ঠিকানাটা মনে হচ্ছে,’ আরেকবার আঁকিবুকিটা দেখে নিলো সাজি, ‘পূর্ব রাজাবাজারের মসজিদের কোণে।’
পটল বাবু এতোক্ষণ ওদের কথাবার্তা হা করে শুনছিল। এবার মুখ খুলল, ‘আপনাদের মনে হচ্ছে, ওই আঁকিবুকিটুকুতেই জজ সাহেব কোথায় আছে সেটা লেখা আছে? পূর্ব রাজাবাজারের মসজিদের কোনে? ঠিক এটাই বলতে চাচ্ছেন তো?’
‘এক্সাক্টলি।’ বলে একবার দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো বৈভব। ‘আপনার হাতে আর সোয়া একঘণ্টা সময় আছে? রাস্তায় কিন্তু এখন বেজায় জ্যাম।’
বৈভবের মুখের দিকে তখনো তাকিয়ে ছিল পটল। ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না সে। কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই। তবে বৈভবের শেষকথাগুলো মাথায় বেজে উঠলো আরেকবার। বৃহষ্পতিবারের বিকেল। রাস্তায় যে কোথায় কতোটা জ্যাম লেগে আছে খোদাই মালুম। তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে দরোজার দিকে বলতে গেলে দৌড়েই চলে গেলো সে।
‘মানেটা কি, বুঝলাম না? কী হয়েছে।’ পটলের গমনপথের দিকে তাকিয়ে বলল সাজি।
বৈভব এবার ব্লটারটা উঠিয়ে পুরো নোটটা পড়তে দিল সাজিকে।
ওইদিন রাত ৮টার দিকে বেজে উঠলো বৈভবের মোবাইল। ‘আপনি কি এখনো অফিসে আছেন?’ পটলকণ্ঠ।
‘আছি।’
‘আরেকটু থাকুন। আমি আধঘণ্টার মধ্যেই আসছি।’
পৌনে একঘণ্টা পর দীর্ঘকায় পক্ককেশ সৌম্য এক ভদ্রলোককে নিয়ে পটলা হাজির বৈভবের চেম্বারে। সাজির সঙ্গে দাবা খেলছিল বৈভব।
ভদ্রলোক দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন বৈভবকে, ‘আমিই সৌগত সাদমান। আমার পরম সৌভাগ্য যে এখনো আমার হাতের আঁকিবুকি বোঝার মতো বিদ্বান লোক আছেন এই শহরে।’
‘আমি নই। কাজটা করেছে আসলে ও।’ সাজিকে দেখিয়ে দিল বৈভব।‘আমি শুধু অনুমান করেছিলাম, ওখানে কোনো একটা মেসেজ থাকতে পারে।’
‘কি করে অনুমান করলেন বলুন তো?’
‘ওই যে পটলবাবু বললেন, আপনি একসময় সাংবাদিকতা করতেন। তাছাড়া আপনার মতো দৃঢ় চরিত্রের একজন লোক ওরকম একটা চিঠি সরাসরি পাঠিয়ে দেবেন, এটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। গুন্ডাদের সামনেই আপনাকে চিরকুটটা লিখতে হয়েছে। ওদের চোখ এড়িয়ে বাইরে কোনো মেসেজ পাঠানোর এছাড়া আর অন্য কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না। তাছাড়া ওই আঁকিবুকিটা যেন আমরা মনোযোগ দিয়ে দেখি সেজন্য চিঠিতে একটা সঙ্কেতও দিয়েছিলেন আপনি।
‘সিএসআর?’ প্রশ্নটা পটলবাবুর।
‘হ্যাঁ। দেখে মনে হবে কোনো জাঁদরেল পদবি।’
‘আমিও তো সেরকমই ভেবেছিলাম।’
‘আসলে কী?’
‘সার্টিফায়েড শর্টহ্যান্ড রিপোর্টার।’
(বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে)

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.