উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল

399
উচ্চ রক্তচাপের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। বলা হয়, এই ওষুধ সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল। কিন্তু ওষুধ ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যেমন ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে। আবার, যথাযথ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধও করা যায়। বাংলা কাগজের পাঠকদের জন্য এবার এ নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন ও অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ।

সবার উচ্চ রক্তচাপ হয় না। উচ্চ রক্তচাপের বেশকিছু কারণ রয়েছে। যেমন, যদি পরিবারে বা বংশের কারোর উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকে, শরীর যদি মুটিয়ে যায়, অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার যদি কেউ গ্রহণ করেন- তাদের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার যাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি বেশি তারাও যদি খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে এই রোগে আক্রান্ত নাও হতে পারেন। সাধারণত উদ্ভিজ্জ খাবার, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শুধু উচ্চ রক্তচাপ থেকেই বাঁচায় না, হার্টের অসুখের ঝুঁকি থেকেও দূরে রাখতে পারে। ওষুধের মাধ্যমে যখন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্যই কাজ করে বলে রক্তচাপের কারণ দূর করতে তেমন সাহায্য করে না। কিন্তু খাদ্যের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করলে তা যুগপৎ কাজ করে। তাছাড়া ওষুধ সেবনের কিছু পার্শ¦প্রতিক্রিয়াও আছে।
কি করবেন?
খাদ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমে জরুরি নিজের খাদ্যভ্যাস সম্পর্কে জানা। কি খাচ্ছেন, কতটুকু খাচ্ছেন, কখন খাচ্ছেন- এগুলো লিখে রাখুন। এক সপ্তাহের হিসেব রাখতে পারলে ভালো হয়। এরপর পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করে নিতে পারবেন আপনার জন্য প্রযোজ্য খাদ্য তালিকা।
খাদ্য তালিকায় পটাশিয়ামযুক্ত খাবারের পরিমাণ বাড়ান। সোডিয়াম (যা খাওয়ার লবণে থাকে) রক্তচাপ বাড়ায়, সোডিয়ামের এই ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে পটাশিয়াম। অনেক ধরনের খাবারেই পটাশিয়াম আছে। সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ হিসেবেও পাওয়া যায়। তবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গ্রহণই বেশি ভালো।
জাঙ্ক ফুড বা ফাস্ট ফুড বা প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে রেস্টুরেন্টে গেলেও রক্তচাপের বিষয়টি মাথায় রেখে মেনু ঠিক করুন। তালিকায় রাখতে পারেন চামড়া ছাড়া মুরগির মাংস, মাছ, বাদামের সালাদ ইত্যাদি। রেড মিট বা লাল মাংস (গরু, খাসি) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
ফ্রিজারে সংরক্ষিত খাবারের চেয়ে টাটকা খাবার অনেক ভালো। কারণ প্রক্রিয়াজাত খাবারে অধিকমাত্রায় সোডিয়াম ও চর্বি থাকে। দুটোই রক্তচাপ বাড়ায়।
দুধ পছন্দ হলে খেতে পারেন। সর বা ননি ছাড়া দুধ বেছে নিতে হবে। সাদা পাউরুটির পরিবর্তে খান লাল পাউরুটি। জুস কিনে না খেয়ে ফল খান বা ফল থেকে নিজেরাই তৈরি করে খান। জুস তৈরির সময় লবণ ও চিনি না দিতে পারলে ভালো হয়।
তেলের মধ্যে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত তেল, যেমন- অলিভ, ক্যানোলা, সয়াবিন, কর্ন, সুর্যমুখীর তেল ভালো। বাটার, নারকেল তেল, পাম তেল যথাসম্ভব কম খান।
পাতে বাড়তি লবণ নেবেন না। রান্নায়ও যতটাসম্ভব লবণ কম ব্যবহার করতে হবে। পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের মশলা ও ফ্লেভার ব্যবহার করে খাবারের স্বাদ বাড়াতে পারেন।
এক চা চামচ লবণের মধ্যে ২৩০০ মি.গ্রা. সোডিয়াম থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে দিনে এর চেয়ে কম সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত। যারা লবণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাদের দিনে ১৫০০ মি.গ্রা. বা তার চেয়ে কম সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত।
চিপস, পাস্তা, ¯œ্যাক্স, আঁচার, ফাস্টফুড, পনির ইত্যাদিতে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে।
সুস্থ থাকার জন্য দিনে সাড়ে তিন হাজার মি.গ্রা. পটাশিয়াম গ্রহণ করা উচিত। পটাশিয়াম পাওয়া যায় দই, পালং শাক, কলায়।
পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। বেশি পানি পান করলে প্র¯্রাব ও ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বাড়তি সোডিয়াম বের হয়ে যায়।
ধূমপান নিজে করলে যেমন ক্ষতি, ঘরের মধ্যে বা পাশের দাঁড়িয়ে আরেকজন করলেও একই ধরনের ক্ষতি। তাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের ধূমপান এড়িয়ে চলুন। তামাকের নিকোটিন রক্তচাপকে ১০ মি.মি/পারদ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। একটি সিগারেট পানের এক ঘণ্টার মধ্যেই এমনটি ঘটতে পারে।
এড়িয়ে চলা উচিত অ্যালকোহলও। অধিক পরিমাণ অ্যালকোহল পান করলে রক্তচাপ বাড়তে থাকে। আবার রক্তচাপ কমানোর ওষুধের কার্যকারিতাও অ্যালকোহলের প্রভাবে কমে যায়।
প্রতিদিন অজান্তেই ক্যাফেইন গ্রহণ করি আমরা। ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় খুব দ্রুত রক্তচাপ বাড়ায়। সাধারণত ক্যাফেইন গ্রহণের ৩০ মিনিট পর শরীরে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ক্যাফেইনের বড় উৎস কফি, এনার্জি ড্রিংকস, চকোলেট আইসক্রিম, মাথাব্যথানাশক ওষুধ ইত্যাদি।
প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। এতে থাকে পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, আঁশ, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন, মিনারেল ও খনিজ উপাদান। যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে, হার্ট ভালো রাখে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য ফলমূল ও শাকসবজির মধ্যে বেশি উপকারী হচ্ছে আপেল, অ্যাসপারাগাস বা শতমূলী, অ্যাভোকাডো, কালোজাম, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, বিট ও বিটের তৈরি জুস, মরিচ, ব্রকলি, বাঁধাকপি, গাজর, ফুলকপি, সরিষা শাক, পালং, বেগুন, শিম, আঙ্গুর, পেয়ারা, তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁয়াজ, কমলা, পেঁপে, কিউই, বড়ই, মিষ্টি আলু, টমেটো, ধুন্দল, লেটুস পাতা ইত্যাদি।
দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর মধ্যে ননীবিহীন দুধ, লবণ ছাড়া পনির, টক দই ভালো। খেতে পারেন সয়া দুধ, বাদাম। এগুলোতে পর্যাপ্ত ক্যালশিয়াম, ভিটামিন এ ও ডি থাকে। মনে রাখা দরকার, চিনি যেন না মেশানো হয়।
মাছ, পোল্ট্রি বা মুরগির মাংস, চর্বি ছাড়ানো মাংস খাওয়া ভালো। আবার লাল মাংস বা রেডমিট ও চর্বিযুক্ত গরু ও খাসীর মাংস এড়িয়ে চলুন। মাছে সাধারণত প্রচুর ওমেগা থ্রি থাকে। সহজলভ্য মাছের মধ্যে তেলাপিয়াতে ভালো মাত্রায় ওমেগা থ্রি থাকে।
ভাত তো খেতেই হয়। ভালো হয় লাল চালের ভাত খেলে। আটার মধ্যে লাল আটা। অনেকের ওট খাওয়ার অভ্যাস আছে। এটাও খুব স্বাস্থ্যকর। এগুলোতে পর্যাপ্ত আঁশ বা ফাইবার থাকে। এই ফাইবার কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
সুপ খেতে যাদের বেশি ভালো লাগে, তারা মাশরুম সুপ বেছে নিতে পারেন। রেস্টুরেন্টের সুপের চেয়ে ঘরে তৈরি সুপ ভালো। কারণ তাতে লবণের পরিমাণটা কম রাখা যায়।
ভর্তা হিসেবে আলুর ব্যবহার কম করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ব্যবহার করুন। কলা ভর্তা, ধুন্দুল ভর্তা, বেগুন ভর্তা, করলা ভর্তা, শিম ভর্তা, বরবটি ভর্তা, শাক ভর্তা, কচু ভর্তা, পেপে ভর্তা, কচুর মুখী ভর্তা, ধনিয়া পাতা ভর্তা, মিষ্টি লাউ ভর্তা, টমেটো ভর্তা- ইত্যাদি বহু পদ তৈরি করতে পারেন। তবে ভর্তায় তেল এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। যদি তেল দিতেই হয় তবে অলিভ অয়েল বা ক্যানোলা অয়েল দিন।
কিছু মশলা ব্যবহার করলে লবণের প্রয়োজন কমে যায়। পুদিনা, গোলমরিচ, মরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, ধনিয়া, জিরা, রসুন ইত্যাদি।
চিনি কম খাওয়া উচিত। কিন্তু বিকল্প চিনি? উচ্চ রক্তচাপের জন্য বিকল্প চিনিও ভালো নয়। তাহলে? সামান্য মধু মাঝে মাঝে খেতেই পারেন। ডায়াবেটিসের সমস্যা না থাকলে এটি শরীরের জন্য উপকারী।
ভুলে গেলে চলবে না, খাবার গ্রহণের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাই সব নয়। পাশাপাশি ব্যায়াম করতে হবে, শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। অলস জীবন যাপন করা যাবে না। নিয়মিত চেকআপও করাতে হবে।
অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.