বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া দল

286
অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার শেষে সূর্যের হাসিমুখ দেখেছেন ক্রিকেট অনুরাগীরা সবাই। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংকটের অবসান ঘটেছে। এদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ ও ভ্রান্তিকর বিতর্কের ইতি ঘটেছে ‘শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে। ৩ আগস্ট মধ্যস্থতায় এসেছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও খেলোয়াড়রা। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এসিএ) ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) মধ্যকার বনিবনা নিয়ে মনোমালিন্যের জেরে গত ১ জুলাই থেকেই কার্যত বেকার হয়ে পড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ২৩০ জনেরও বেশি ক্রিকেটার। সেই সঙ্গে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাতিলসহ দেশটির ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরও সংশয়ে পড়েছিল। তবে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট আবারও আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরও আশার আলো দেখছে।
 গত কয়েকমাস ধরে আর্থিক দাবি নিয়ে একধরনের যুদ্ধই যেন চলছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অঙ্গনে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড গত সপ্তাহে দাবি  মেনে না নিলে মামলা করার হুমকি দেওয়ার পর ৪০ বছরের ইতিহাসের প্রথম ‘ক্রিকেট শিল্প সংকট’ এর অবসান ঘটে। তবে কয়েকদিন আগেই সিএ ও এসিএ এর মৌখিক আলোচনার পর সুখবর আসছে বলে জানিয়েছিল এসিএ।
সপ্তাহ শেষের আগেই ৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার মুখোমুখি আলোচনার চূড়ান্ত ধাপে দু’পক্ষের মত শেষপর্যন্ত চুক্তিতে এসে ঠেকেছে।
বেতন-ভাতার কাঠামো পরিবর্তনের দাবি-দাওয়া মনোমালিন্য শুরু হয় সিএ ও এসিএ এর মধ্যে। পুরোনো নীতিমালা অনুযায়ী বোর্ডের রাজস্ব আয়ের একটা অংশ ভাগ করে দেওয়া হতো অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটার এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের। এবার সেটিতে খানিকটা বদল আনতে চেয়েছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। জাতীয় ক্রিকেটারদের লভ্যাংশ বাড়িয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের এর বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সে অর্থ বোর্ড খরচ করতে চেয়েছিল দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের অন্যান্য খাতে। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটারদের স্বার্থ রক্ষায় এর বিরোধিতা করে এগিয়ে আসেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। দুই পক্ষের অনড় মনোভাবের ফলে বেকার দিনযাপন শুরু হয় ওয়ার্নার-স্মিথসহ দেশটির ২৩০ জন শীর্ষ ক্রিকেটারের। ‘বৈঠক পে বৈঠক’ দিয়েও কোনো সমাধানে আসতে পারেন নি সিএ ও এসিএ। তবে অবশেষে সমাধানে এসেছে দুই পক্ষ। সেই সুবাদে স্বস্তি ফিরে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনেও। দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে আগামী ১৮ আগস্ট স্টিভেন স্মিথের দল যাচ্ছে বাংলাদেশ সফরে। এছাড়া আসন্ন গ্রীষ্মকালীন অ্যাশেজ সিরিজটিও এগিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আগামী অক্টোবরে ভারত সফরের কথাও রয়েছে দলটির।
যেভাবে অবসান ঘটল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বিতর্কেরঃ
৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে শেষবারের মতো এসিএ’র মুখোমুখি হবে বলে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড বলেন, সমাধানে না এলে এরপর এসিএ এর সাথে আদালতে দেখা হবে। গত মঙ্গলবার বৈঠকে বসে দুই পক্ষ। আলোচনায় মূল বিষয়গুলোর বেশিরভাগেরই সমাধান হলেও কোনো সিদ্ধান্তে আসা নিয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি কেউই। তবে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সমাধান আসতে পারে বলে জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দলের সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার। হলোও ঠিক তাই, মুখোমুখি আলোচনার চূড়ান্ত ধাপে ৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে দুপক্ষের মৌলিক দিকগুলোয় একমত হয়ে দুই পক্ষই চুক্তিতে সই করেছে। সকালে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী অ্যালিস্টার নিকোলসনের সঙ্গে মিলে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড দুই পক্ষের সমঝোতার বিষয়টি ঘোষণা দেবেন বলে জানানো হয়। এরপর স্থানীয় সময় সাড়ে চারটায় মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিসি)’তে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতার এ ঘোষণা দেয়া হয়। নতুন চুক্তিতে বেশ নতুনত্ব থাকলেও আগের বেতন কাঠামোই অপরিবর্তিত রয়েছে।
জিতে গিয়েও পরাজয়ঃ
বৃহস্পতিবার মুখোমুখি আলোচনার চূড়ান্ত ধাপে দুপক্ষের মত এক চুক্তিতে এসে ঠেকেছে। তবে এই চুক্তিতে দুই পক্ষের জয় হলেও পরাজয় হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের বলে ভাবছেন অনেকেই।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে চূড়ান্ত সুবাতাস বইতে শুরু করলেও এর প্রভাব নিয়ে দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের ক্রীড়া সম্পাদক গ্রেগ বাম তাঁর পত্রিকায় এক প্রতিবেদন লেখেন। প্রতিবেদনে ক্রিকেটের কতটুকু ক্ষতি হল বিশ্লেষণ করে বলেন, প্রথম থেকেই এই সমস্যার মূলে ছিল শুধু রাজস্বের অংশ ভাগাভাগি করার বিষয়টি। সমস্যার সমাধানে দুই পক্ষই ভাবছে তারা জিতেছে। এসিএ আগের বেতন কাঠামোই অপরিবর্তিত থাকায় খুশি আর সিএ খুশি নতুনত্ব থাকছে বলে। কিন্তু সত্য এটাই যে দুই পক্ষই ‘পরাজিত’, বলে উল্লেখ করেন বাম। তিনি বলেন, দুই পক্ষই বলছে তারা একে অপরকে সম্মান করে, সেইসঙ্গে দুই পক্ষকেই পরস্পরকে অবমাননা করতে দেখা যায়।
বাম আরও বলেন, বনিবনার মাঝখানে পিষে গেছে শুধু অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট শিল্প। নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে ১ জুলাই থেকে বেকার ছিলেন দেশটির ২৩০ জন শীর্ষ ক্রিকেটার। বাতিল করা হয়েছিল সাউথ আফ্রিকা সফরসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এছাড়া বিশ্বের ক্রিকেট অঙ্গনেও অস্ট্রেলিয়ার এই ক্রিকেট সংকট অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ক্রিকেট ইতিহাসে বোর্ডের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্বের এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতে  জিম্বাবুইয়ান ও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের সংগে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ইস্যুতে মনোমালিন্যের ঘটনা ঘটেছে। আর এর কারণে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্রিকেট অঙ্গনে বৈরী প্রভাব পড়েছিল। যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ের এমন সংকট, ভবিষ্যতেও তাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কী কোনো প্রভাব ফেলবে না ? এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে এই সংকট সম্পূর্ণ নিরসনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট আলোর পথেই এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদী অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অনুরাগীরা।

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.